• শিরোনাম

    অরিত্রির আত্মহত্যা : ক্ষোভে উওাল ভিকারুননিসা

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮

    অরিত্রির আত্মহত্যা : ক্ষোভে উওাল ভিকারুননিসা

    রাজধানীতে বাবা-মায়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে স্কুল ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী (১৫) আত্মহত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুসছে সারাদেশ। অমানবিক আচারণের নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির এই ছাত্রীর অকালে চলে যাওয়াকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না কেউই। পরীক্ষা বর্জন করে সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত স্কুলের সব গেটে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

    গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে স্কুল ক্যাম্পাস। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও স্কুলটির অধ্যক্ষের পদত্যাগসহ ৫ দফা দাবি তুলে মিছিল করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সেখানে উপস্থিত হলে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে গতকালের কর্মসূচি শেষ করেছে। আজ বুধবার আবারও তারা স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করবে বলে জানা গেছে।

    এদিকে এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রনালয় ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল কর্তৃপক্ষ পৃথক ২টি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। হাইকোর্টও ৫ সদস্যের আলাদা একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রনালয়কে। সাময়ীকভাবে বরখাস্ত  করা হয়েছে স্কুলটির প্রভাতী শাখার প্রধান শিক্ষিকা জিন্নাত আরাকে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষ্যে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে, মোবাইল ফোনে নকল করার কারণে অরিত্রিকে টিসি দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন স্কুলটির প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌস।

    গতকাল সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লাস বর্জন করে সকাল ১০টা থেকে স্কুলটির ১ নম্বর গেটের সামনে জড়ো হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’, ‘অধ্যক্ষের পদত্যাগ চাই’, ‘আর এমন মৃত্যু চাইনা’, এ ধরণের লেখা সম্বলিত প্লেকার্ড নিয়ে তারা স্কুলটির সামনে বসে মিছিল দিতে থাকে। এক পর্যায়ে অভিভাবকরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিলে অবস্থা চরম আকার ধারণ করে। স্কুলটির সামনের রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে তারা। এসময় শিক্ষার্থীরা ৫ দফা দাবি তুলে ধরে বিক্ষোভ করে। ‘অরিত্রীর মতো আর কোনো শিক্ষার্থী হারাতে চাই না। অধ্যক্ষ, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও গভর্নিং বডির সদস্যদের অপসারণ চাই, আত্মহত্যার প্ররোচণাকারীদের বিচার চাই’ ব্যানার নিয়ে বিকেল ৪টার দিকে ভেতর থেকে বেড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা।

    অন্যদিকে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও তার কথা না শুনে প্রিন্সিপালের পদত্যাগ দাবি করেন বিক্ষুদ্ধরা। এরপর দিনভর স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়ে থাকে শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সন্ধ্যার দিকে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের তদন্ত কমিটির সদস্যরা তাদের আশ্বস্ত করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এসময় তারা তিন দফা কর্মসূচী ঘোষণঅ করে। যার মধ্যে রয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন দিনের মধ্যে সুষ্ঠু বিচার না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে, সব পরীক্ষা বর্জন ও বুধবার সকাল ১০টায় ফের প্রধান ফটকে অবস্থান নেয়া।

    এছাড়া ৫ দফা দাবি তুলে ধরে তারা জানায়, প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপালের পদত্যাগ করতে হবে, স্কুলের গভর্নিং বডি বাতিল করতে হবে, এ ঘটনার দ্রুত বিচার করতে হবে এবং এ ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি আর না হয় সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। তা না হলে আমাদের আন্দোলন চলবে। আমরা আর কোনো অরিত্রিকে হারাতে চাই না। অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন শিক্ষকেরা। অভিভাবকদের কারও কথা আমলে নেয়া হয় না। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে সব জায়গায়। আলোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও।

    এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী কতটা অপমানিত হলে, কতটা কষ্ট পেলে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়? যে ঘটনাটি আমরা শুনছি, এর পেছনের কথা শুনছি, ঘটনার পেছনে বা ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. ইউসুফকে প্রধান করে তিন সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাউশির ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন ও ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। স্কুলটি সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, জনপ্রিয়তার কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়মের কথা অনেক আগেই কানে এসেছে। এসব অনিয়মের কারণে টাকার বিনিময়ে ভর্তি বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়। এখানে ভর্তির জন্য একসময় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হতো, যা বন্ধ করা হয়েছে।

    ভিকারুননিসা স্কুলের প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌস বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমরা সবাই মর্মাহত। যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. আতাউর রহমানকে (অভিভাবক প্রতিনিধি) প্রধান করে তিন্না খুরশীদ জাহান (নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদের অভিভাবক প্রতিনিধি) এবং ভিকারুননিসার শিক্ষক ফেরদৌসী বেগমের সমন্বয়ে তিন সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে ওই কমিটিকে প্রতিবেদনে দিতে বলা হয়েছে। যে শিক্ষক তাকে ভর্ৎসনা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে বা যিনি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তদন্তে যদি এর প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

    এদিকে গতকাল দুপুরে হাইকোর্টের বিচারপতি এফ আর এফ নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ঘটনাটির কারণ খুজতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। কমিটিতে একজন অতিরিক্ত শিক্ষা সচিব, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও বিচারক থাকবেন। তারা অরিত্রি আত্মহত্যার ঘটনা এবং সারাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা তদন্ত করে কারা দায়ী তা খুঁজে বের করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দেবেন।

    এছাড়া এ ঘটনায় স্কুলের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ পাঁচ জনের সাময়িক বরখাস্ত চেয়ে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে ওই শিক্ষকদের বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের এবং প্রতিষ্ঠানটির অন্যসব শাখা প্রধানদের প্রধান পদ থেকে অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে। অধ্যক্ষ ছাড়াও যাদের বরখাস্ত করতে বলা হয়েছে তারা হলেন, স্কুলটির সহকারী প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরা (ইতোমধ্যে বরখাস্ত ) এবং শিক্ষক প্রতিনিধি মোস্তারি সুলতানা, ড. ফারহানা খানম ও মাহবুবুর রহমান মিঠু।

    গতকাল অভিভাবকদের পক্ষে ভিকারুননিসা স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতিকে নোটিশটি পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. ইউনুছ আলী আকন্দ। নোটিশ প্রাপ্তির পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে এ বিষয়ে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

    উল্লেখ্য, গত সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে শান্তিনগর ২৩/২৪ নম্বর বাসায় গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে অরিত্রি। তার বাবা দিলীপ অধিকারী জানান, স্কুলে ফোন নেয়া নিষেধ থাকলে গত রবিবার অরিত্রি মোবাইল নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যায়। এনড্রয়েড মোবাইল দেখে নকল করার অপরাধে মোবাইল ফোন নিয়ে তাকে পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেন দ্বায়িত্বর শিক্ষাক।

    এরপর অরিত্রির বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে বলা হয় অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস জানান, পরীক্ষার সময় মোবাইলে নকল করায় অরিত্রিকে টিসি দেয়া হয়েছে। এসময় অরিত্রির মা-বাবা টিসি না দেয়ার জন্য অনুরোধ করলে তাদেরকে চরমভাবে অপমান করা হয়। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে বাসায় গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে অরিত্রি। গতকাল ময়না তদন্ত শেষে রাজধানীর একটি শশ্মানে তার শেষকৃৎ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তার বাবা।

    এ বিষয়ে গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি জানিয়ে পল্টন মডেল থানার এসআই আতাউর রহমান বলেন, মৃত অরিত্রির মা-বাবাকে অনুরোধ করা হয়েছে অভিযোগ দায়ের করার জন্য। তারা থানায় আসলেই মামলা নেয়া হবে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com