• শিরোনাম

    এক চালকের পা বিচ্ছিন্ন করলো আরেক চালক

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৮ এপ্রিল ২০১৮

    এক চালকের পা বিচ্ছিন্ন করলো আরেক চালক

    প্রাইভেটকার চালক রাসেল সরকার (২৫)। ধোলাইপাড় হয়ে অন্যত্র যাওয়ার সময় গ্রীন লাইন পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-২৭৮৬) তার প্রাইভেটকারে লাগিয়ে দেয়। রাসেল প্রাইভেটকার থেকে নেমে গ্রীন লাইনের চালককে বাসটি থামাতে বলেন। গ্রীন লাইন চালক বাসের গতি কিছুটা কমায়। রাসেল তখন তাকে বাস থেকে নামতে বলেন। কিন্তু গ্রীন লাইন চালক না নেমে প্রাইভেটকার চালক রাসেলকে ফ্লাইওভারের রেলিংয়ের সাথে ঠেকিয়ে চাপা দিয়ে ফ্লাইওভার হয়ে চলে যায়। সাথে সাথে রাসেলের বাম পা কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আজ শনিবার বেলা ৩টার দিকে ধোলাইপাড় থেকে হানিফ ফ্লাইওভারে উঠার গোড়ায় এ ঘটনা ঘটে।

    পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন সোহাগ, আকাশ ও মাশরুরসহ বেশ কয়েকজন। পরে অবশ্যই একটি মোটরসাইকেল নিয়ে বাসটির পিছু ছুটে হাইকোর্ট মোড়ে এসে পুলিশের সাহায্যে বাসটিকে আটক করেন সোহাগ ও আকাশ। চালক কবির হোসেনকে ও বাসটিকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

    সোহাগ জানান, ধোলাইপাড় থেকে হানিফ ফ্লাইওভারে উঠার গোড়ায় প্রাইভেটকার চালক রাসেল গ্রীন লাইন বাসটিকে থামান। তিনি গ্রীন লাইন চালককে বলেন, ভাই, আপনি চাপা দিয়ে আমার প্রাইভেটকারটি কি করেছেন? একটু নেমে দেখেন। গ্রীন লাইন চালক রাসেলের কথার কোন উত্তর-ই দিচ্ছিল না। সে গাড়িটি সামান্য এগিয়ে নেয়। এ সময় রাসেল একটি ইট নিয়ে গ্রীন লাইন চালককে বলে, বাস থেকে না নামলে ইট দিয়ে গাড়ির কাঁচ ভেঙে দিবো। গ্রীন লাইন চালক তখন রাসেলের দিকে গাড়িটি নিয়ে যায়।

    রাসেল ফ্লাইওভারের রেলিংয়ের সাথে আটক পড়ার ভয়ে পশ্চিম পাশে চলে যায়। গ্রীন লাইন চালক বাসটিকে আবার পশ্চিম পাশে রাসেলে দিকে ধেয়ে নেয়। রাসেল সেই পাশ থেকে আবার পূর্ব পাশে চলে আসে এবং বলতে থাকে, না নামলে এবার কিন্তু সত্যি সত্যি গাড়ির কাঁচ ভেঙে দিবো। গ্রীন লাইন চালক এবার রাসেলকে বাস দিয়ে চাপা দেয়। এতে ফ্লাইওভারের রেলিংয়ের সাথে আটকা পড়ে রাসেল। দেহটি কোন মতে সরাতে পারলেও গাড়ির চাকাটি রাসেলের বাম পায়ের উপর দিয়ে উঠিয়ে দেয় চালক। পা’টি রেলিংয়ের সাথে ঠেকে যায়। এতে গাড়ির চাকার চাপে সাথে সাথে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। আর রাসেলের দেহটি রেলিংয়ের বাহিরের রাস্তায় পড়ে যায়। চোখের সামনে এমনটি ঘটলেও কারো কিছু করার ছিলো। ঘটনাটি দেখে এবং রাসেলের চিৎকারে লোকজন ছুটে আসেন। সবাই তখন রাসেলকে হাসপাতালে নিতে ব্যস্ত।

    সোহাগ বলেন, রাসেলকে চাপা দিয়েই চালক দ্রুত গতিতে গাড়িটি চালিয়ে ফ্লাইওভার হয়ে চলে যাচ্ছিল। আমি দ্রুত একটি মোটরসাইকেল নিয়ে পিছনে একজনকে বসিয়ে বাসটির পিছু ছুটি। এসে ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় (চাঁনখারপুল সংলগ্ন) বাসটিকে আটক করি। টোল প্লাজায় থাকা লোকজনকে বলি, এই (গ্রীন লাইন) বাস চালক ইচ্ছাকৃতভাবে একজনকে চাপা দিয়ে পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। আপনারা বাসটি আটক করেন। কিন্তু তারা বলেন, আমাদের এখানে আটক করা সম্ভব নয়। আপনারা নিচে গিয়ে (ফ্লাইওভার থেকে নামলে) পুলিশকে বলেন।

    সোহাগ তখন মোটরসাইকেল টান দিয়ে চাঁনখারপুল ফ্লাইওভারের গোড়ায় এসে পুলিশকে বিষয়টি বলেন। কিন্তু গ্রীন লাইন চালক চাঁনখারপুল দিয়ে না গিয়ে কৌশলে আনন্দ বাজার সংলগ্ন ক্রসিং হয়ে বেরিয়ে আসে। চাঁনখারপুলে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সোহাগকে বলেন, চালক তো গাড়ি নিয়ে এখান দিয়ে আসেনি। আনন্দ বাজার মোড় হয়ে চলে গেছে। আপনি গিয়ে সেখানকার দায়িত্বে থাকা পুলিশকে বিষয়টি বলেন। সোহাগ সেখান থেকে ছুটে আসেন আনন্দবাজার মোড়ে। সেখানকার দায়িত্ব থাকা ট্রাফিক পুলিশকে বললে তারা ওয়াকিটকির মাধ্যমে পুলিশকে বিষয়টি জানায়। বাসটি বঙ্গবাজার ও ঢাবির ফজলুল হক হলের সামনে দিয়ে হাইকোর্ট মোড়ে আসে। সোহাগরাও সেই পথে আসেন। হাইকোর্ট মোড়ে এসে দেখেন ট্রাফিক পুলিশ বাসটিকে আটক করেছে।

    সোহাগের সঙ্গে গাড়িটির পিছু নেয়া আরেক প্রত্যক্ষদর্শী আকাশ বলেন, ধোলাইপাড়ে ঘটনাটি ঘটার সময় বাসে কোন যাত্রী ছিলো না। চালক, হেলপার ও কন্ডাক্টর ছিলো। হাইকোর্ট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ যখন বাসটি আটক করে তখন শুধু চালক ছিলো। কিছুক্ষণ পর শাহবাগ থানার একটি গাড়ি এসে গাড়িটিসহ চালককে থানায় নিয়ে যায়। এদিকে বেশ কয়েকজন রাসেলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। মাশরুর নামের এক প্রত্যক্ষদর্শীও ঢামেকে আসেন। এক হাতে রাসেলের বিচ্ছিন্ন হওয়া পা, আরেক হাত দিয়ে রাসেলকে ধরে ঢামেক জরুরি বিভাগে নিয়ে যান মাশরুর।

    সেখানে রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, একটি কোম্পানি তার গাড়িটি ভাড়া করেছিল। ওই কাজ শেষ করে কেরানীগঞ্জ থেকে তিনি ঢাকায় ফিরছিলেন। ফেরার সময় যাত্রাবাড়ীতে গ্রীন লাইন পরিবহনের একটি বাস তার গাড়িকে ধাক্কা দেয়। পরে গাড়ি থামিয়ে বাসের সামনে গিয়ে বাসচালককে নামতে বলেন তিনি। শুরু হয়ে যায় বাসের চালক ও রাসেলের মধ্যে কথা-কাটাকাটি। এ সময় গ্রীন লাইন পরিবহনের চালক বাসটি বারবার তার দিকে নিচ্ছিল।

    ভয়ে তিনি একবার পশ্চিম পাশে আবার পূর্বে পাশে সড়ে যান। এভাবে কয়েকবার করার পর চালক রেলিংয়ের সঙ্গে বাসটি দিয়ে তাকে ঠেক দেয়। এতে তিনি আটকা পরলে বাসের চাকা তার বাম পায়ের উপর উঠিয়ে দেয়। আতঙ্কিত কণ্ঠে এসব কথাগুলো বলছিলেন রাসেল। তার চোখজোড়ায় আতঙ্কের ছাপ। স্পষ্ট করে কথাও বলতে পারছিলেন না। কিছুক্ষণ থেমে থেকে পরক্ষণে বলছিলেন, অয় (গ্রীন লাইন চালক) চেয়েছিল গাড়ি চাপা দিয়ে রাস্তায় আমাকে পিষে ফেলতে। তাই বার বার আমাকে চাপা দিতে চেয়েছিল!

    ঢামেক হাসপাতালে ব্যান্ডেজ শেষে তাকে প্রেরণ করা হয় স্কয়ার হাসপাতালে। খবর পেয়ে ইতোমধ্যে ছুটে আসেন তার সহকর্মী আরিফ। স্কয়ারে নেয়ার পর সেখানকার চিকিৎসকরা আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য রাসেলকে অ্যাপোলে হাসপাতালে প্রেরণ করেন বলে সন্ধ্যায় জানিয়েছেন সহকর্মী আরিফ।

    আরিফ জানান, রাসেল ‘সাগর রেন্ট-এ-কার’ নামে একটি কোম্পানি থেকে গাড়ি নিয়ে চালাতেন। মূলত তিনি নোয়া গাড়ির চালক ছিলেন। গাড়িটি ব্যক্তিগতভাবেই চালাতেন। তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ি উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামে। ঢাকায় আদাবর ১০ নম্বর রোডের সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন হাসপাতালে আসছেন, বললেন আরিফ।

    হাইকোর্ট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ গাড়িটি আটকানোর পর সেখান থেকে চালক ও গাড়িটি থানায় নিয়ে যান শাহবাগ থানার এসআই মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, চালক কবির হোসেনে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বিকেল শাহবাগ থানার ওসি বলেন, বাস ও চালককে নিতে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ এসেছে। ঘটনাটি যেহেতু যাত্রাবাড়ী থানাধীন ঘটেছে সেহেতু সেই থানায় মামলা হবে।

    যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আজিজুর রহমান বলেন, এখনো (রাত ৮টা) মামলা হয়নি। আমার থানায়ই মামলা হবে। রাত ৭টার দিকে রাসেলের সঙ্গে অ্যাপোলো হাসাপাতালে থাকা তার সহকর্মী আরিফ মুঠোফোনে বলেন, রাসেলকে মাত্র অপারেশন থিয়েটার রুমে নিয়েছে। চিকিৎসকরা রক্ত সংগ্রহ করতে বলেছে। আমরা রক্তের সন্ধানে বেরিয়েছি। তবে রাসেল আশঙ্কামুক্ত নাকি আশঙ্কাযুক্ত সেই বিষয়ে চিকিৎসকরা কিছু জানায়নি। কিছুক্ষণ পর যোগাযোগ করা হলে আরিফ বলেন, ওটিতে রাসেলের বিচ্ছিন্ন হওয়া পা’টিও নেয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা পা’টি জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর অ্যাপোলোতে রাসেলের স্ত্রীসহ অনেক স্বজনরা এসেছেন। তার স্ত্রী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।

    প্রসঙ্গ, গত ৩ এপ্রিল বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দু’টি বাস চাপায় হাত ও জীবন হারাতে হয়েছে সরকারি তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনকে। এরপর ২০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টার দিকে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে বিআরটিসির আরেকটি বাসের ধাক্কায় পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় গৃহকর্মী রোজিনা আক্তারের। এরপর গোপালগঞ্জে ট্রাকের চাপায় হাত হারায় পরিবহন শ্রমিক হ্নদয়। শুধু রাজীব, রোজিনা কিংবা হ্নদয় নয়; সড়কে এভাবে প্রতিনিয়ত কাউকে না কাউকে হাত/পা হারাতে হচ্ছে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে পাল্লা দিয়ে। হরহামেশায় সড়কে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও দেখার যেন কেউ নেই!

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com