• শিরোনাম

    হাতঘড়ির বিশেষ ডিভাইস দিয়ে তথ্য চুরি

    ক্রেডিট কার্ড ক্লোন গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা লুট

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৬ এপ্রিল ২০১৮

    ক্রেডিট কার্ড ক্লোন গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা লুট

    সুপার শপ স্বপ্ন’র কর্মচারী শরিফুল ইসলাম (৩৩)। গ্রাহকদের ডেবিড ও ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বর চুরি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় সেই দেশের এক রুমমেটের কাছে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির হাতেখড়ি হয় তার। এরপর দেশে ফিরে এ কৌশল প্রয়োগ করে বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন শরিফুল।

    গতকাল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, সুপার শপে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করার সময় শরিফুল ব্যবহার করতেন ডিজিটাল হাতঘড়ি, যাতে সংযুক্ত করা ছিল বিশেষ মিনি কার্ডরিডার। সেটা দিয়েই গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করতো। ৫টি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতির মূলহোতা শরিফুল। তার কাছ থেকে ১৪০০টি ক্লোন কার্ডসহ একটি টয়েটো এলিয়ন গাড়িও জব্দ করা হয়েছে।

    এদিকে, কার্ড জালিয়াতির মামলায় শরিফুল ইসলামকে চার দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম ফাহাদ বিন আমিন চৌধুরী রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এর আগে, মিরপুর থানার দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত ঘটনার রহস্যে উদঘাটনের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলা তদন্ত কর্মকর্তা সাইবার পুলিশের এসআই ফজলে রাব্বী।

    গতকাল দুপুরে সিআইডি সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, হাতঘড়িতে সংযুক্ত বিশেষ মিনি কার্ড রিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের এটিএম কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্য স্ক্যান করা হতো। তারপর গ্রাহক যখন পিন নম্বর দিতো কৌশলে সেটিও টুকে নেওয়া হতো এবং বিলের রি-প্রিন্ট দিয়ে ওই কপির পেছনে লিখে রাখতো। এভাবেই এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করতো প্রতারক শরিফুল। পাঁচটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শরিফুলকে গ্রেফতারের পরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

    মঙ্গলবার রাতে মিরপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডি’র অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, ১ হাজার ৪০০টি ক্লোন কার্ড, একটি ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ কার্ড রিডার ও রাইটার, তিনটি পজ্ মেশিন, সচল ডিজিটাল হাতঘড়ি (গ্রাহকদের তথ্য চুরিতে ব্যবহৃত), দুটি মিনি কার্ড রিডার ডিভাইস, ১৪টি পাসপোর্ট ৮টি মোবাইল ফোন সেট, একটি ডাচ বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস ক্রেডিট কার্ড, ৩টি এনআইডি কার্ড, একটি পরচুলা ও একটি কালো রংয়ের সানগ্লাস জব্দ করা হয়।

    মোল্লা নজরুল ইসলাম আরো বলেন, চলতি বছরের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংঘটিত পাঁচটি (ব্র্যাক ব্যাংক, সিটিব্যাংক, ইবিএল ব্যাংক, ইউসিবিএল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া) ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি ঘটনার তদন্ত হয়। আমরা জানতে পারি, ব্যাংকের গ্রাহকরা বিভিন্ন সুপার শপ ও ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে পণ্য কেনার পর কার্ড পাঞ্চ করার সময় একটি চক্র সুকৌশলে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করে। পর এসব ক্লোন কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি করে নিচ্ছে। সেই অভিযোগে আসামি শরিফুলকে মিরপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়।

    তিনি বলেন, শরিফুলের গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরের হেমায়েতপুর। তিনি হাট বোয়ালীয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হতে ২০০১ সালে এসএসসি এবং গাঙনী ডিগ্রী কলেজ হতে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের জন্য রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর তিন বছর মেয়াদী ডিগ্রী নিয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তার রাশিয়ান রুমমেট ইভানোভিচ এর কাছ থেকে ক্রেডিট কার্ড প্রতারণার কৌশল শিখে আসে।

    দেশে আসার পরপরই সে কার্ড জালিয়াতি শুরু করে। ২০১৩ সালে এই সংক্রান্তে দুইটি মামলা হয় এবং সেই মামলায় প্রতারক শরিফুল ১৮ মাস জেলে থাকে। এরপর সে কিছুদিন স্টুডেন্ট কন্সালটেন্সি ফার্ম খুলে, সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে রুমমেটের কাছ থেকে শিখা কৌশল আবারও কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। শরিফুলের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি চলছে।

    সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, শরিফুল সুপার শপ স্বপ্ন’র বনানী শাখায় কাজ করার সময়ে নিজের হাতঘড়িতে সংযুক্ত বিশেষ স্কিমিং মিনি কার্ড রিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্যাবলি নিয়ে নিতো। তারপর গ্রাহক যখন পিন নাম্বার দিতো তখন কৌশলে পিন নাম্বার দেখে নিয়ে বিল পরিশোধের পর আবার গ্রাহকের যাবার পর রি-প্রিন্ট দিয়ে কপিটা সংগ্রহ করে তার পিছনে পিন নাম্বারটি লিখে রাখতো। পরে সে তার বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ এবং ডিভাইসের মাধ্যমে কাস্টমারের তথ্যাবলি ভার্জিন কার্ড বা খালি কার্ডে স্থাপন করে ক্লোন এটিএম কার্ড বানিয়ে কোনো একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিতো। বুথে টাকা তোলার সময় সিসি ক্যামেরায় যাতে তাকে চেনা না যায় সে জন্য পরচুলা এবং চশমা ব্যবহার করতো।

    তিনি আরো বলেন, সুপার শপে চাকরি করলেও তার মূল পেশা ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এই জালিয়াতি মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ টাকায় সে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতো। শরিফুল ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়ি ব্যবহার করে এবং তার ব্যাংক একাউন্ট পর্যালোচনা করে এ পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে।

    এসময় ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস কোয়ালিটি জারা জাবীন মাহবুব বলেন, কয়েকজন গ্রাহক তাদের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন যে ব্যাংক থেকে কেউ তাদের টাকা তুলে নিয়েছে। তখন তারা আমাদের জানালে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দেই। পরে আমরা বিষয়টি সিআইডিকে জানাই। মার্চ মাসে এ সংক্রান্ত নয়টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com