• শিরোনাম

    নয়াপল্টনে বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৫ নভেম্বর ২০১৮

    নয়াপল্টনে বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ

    রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৪ নভেম্বর বুধবার দুপুরের দিকে এ সংঘর্ষ বাধে। থেমে থেমে তা বেলা ৩টা পর্যন্ত চলতে থাকে। সংঘর্ষের সময় পুলিশের ছোড়া প্যালেট বুলেটে (ছররা গুলির মতো) ১৫-২০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

    অন্যদিকে পুলিশেরও ১৩ জন সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংঘর্ষের সময় বিক্ষব্ধ জনতা পুলিশের দুইটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া আশপাশের আরো কয়েকটি পাবলিক বাসে ভাংচুর চালায়। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে সাঁজোয়া যান ও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করলে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

    প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গতকাল সকাল থেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা-কর্মীরা এসে জড়ো হচ্ছিল। এতে ওই এলাকার রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পুলিশও রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীদের সরে দাঁড়াতে বলেন, ফুটপাতে চেপে দাঁড়াতে বলে। এরপরই মধ্যে বেলা পৌনে একটার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বড় একটি মিছিল নিয়ে ঢাকা-৮ আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম কিনতে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আসেন।

    ওই সময় কার্যালয়ের সামনে থেকে তার মিছিল সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। তবে কর্মী-সমর্থকেরা সরে না যাওয়ায় একপর্যায়ে পুলিশের গাড়ি মিছিলের ওপর উঠে যায়। এতে কয়েকজন আহত হন। এ নিয়ে কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে পুলিশের বাগ্বিতন্ডা হয়। মুহূর্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ কয়েকজন কর্মী-সমর্থককে লাঠিপেটা করে। পুলিশের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পুলিশ প্যালেট বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। উপস্থিত লোকজন দিগি¦দিক ছুটতে থাকে।

    এ সময় বিএনপি নেতা-কর্মীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে পুলিশ সদস্যরা পিছু হটে নাইটিঙ্গেল মোড়ে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে, বিএনপির নেতাকর্মীরা নয়াপল্টন এলাকার বিভিন্ন গলিতে অবস্থান নেন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে স্কাউট ভবন পর্যন্ত মিছিল করেন। এ সময় পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান এবং একটি প্রাইভেটকারে আগুন ধরিয়ে দেয় নেতাকর্মীরা। তাদের ছোড়া ইট-পাটকেলেও বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। রাস্তায় চলাচল করা অন্যান্য ব্যক্তিগত গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। সংঘর্ষের কারণে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে আশপাশের এলাকার সড়কে প্রচন্ড যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশের জলকামান ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হলে বেলা ৩টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে।

    পল্টন থানার ওসি মাহমুদ হোসেন বলেন, বিএনপি পার্টি অফিসের সামনে আসা নেতাকর্মীরা সড়কে বিশৃঙ্খলভাবে অবস্থান করছিল। পুলিশ তাদের সুশৃঙ্খলভাবে থাকতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তারা বিনা উসকানিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
    বেলা দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে গাড়িতে দেওয়া আগুন নেভাতে কাজ শুরু করেন। তবে বিএনপিকর্মীরা রাস্তায় আটকে রাখায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয় বলে অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর কর্মীরা জানান।

    সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের প্যালেট বুলেটে আহত ১২ জনের তাৎক্ষণাৎ নাম পরিচয় জানা গেছে। তারা হলো- বিমানবন্দর থানা এলাকার মহিউদ্দিন রতন, মাদারীপুরের সাখাওয়াত হোসেন এবং পিরোজপুরের আসাদুজ্জামান। তাদের গলা, মাথা ও পিঠে প্যালেট বুলেটের আঘাত লেগেছে। পিরোজপুরের নেছারাবাদের শামসুল হক, রাজধানীর মুগদার অরিন, মেহেদি হাসান মিরাজ, পল্টনের কাদির, হৃদয় শেখ, মতিঝিলের মকবুল হোসেন, সবুজবাগের মনির হোসেন, খিলগাঁও থেকে আসা মোস্তাক, কলাবাগান থেকে আসা সুমন। তবে উপস্থিত লোকজন ও বিএনপির নেতারা বলছেন, প্যালেট বুলেট বিদ্ধ হয়ে আরো অনেকে রক্তাক্ত হয়েছেন। পুলিশের লাঠিপেটায়ও আহত হয়েছেন অনেকে। তাদেরকে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

    মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে আসা মিছিলের ওপর পুলিশের গাড়ি উঠিয়ে দেয়া থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও অনেক নেতাকর্মীরা বলছেন, পুলিশের নির্দেশে তারা ফুটপাতে সরে না যাওয়ায় পুলিশ দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তখন উপস্থিত নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যরা বলছেন ভিন্ন কথা।

    তারা বলেন, গতকাল বেলা পৌনে ১টার দিকে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস ও আখতারুজ্জামানের কর্মী-সমর্থকরা মিছিল নিয়ে বিএনপি কার্যালয়ের দিকে আসার সময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে গেলে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা ঢিল ছুড়তে শুরু করে। এতে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।

    ঘটনার পর পর সেখানে আসেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের রাস্তা ছেড়ে দিয়ে গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দিতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ফুটপাতে অবস্থান গ্রহণের অনুরোধ জানান। রিজভী অভিযোগ করেন, সকাল থেকে নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করছিলেন। দুপুরে পুলিশ বিনা উস্কানিতে হামলা চালায়। এতে আব্বাস, নাহিদ, মুকুল, মোস্তাফা, স্বপন, হারুনসহ ২০ জনের মতো নেতাকর্মী পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন। এ সময় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির একটি চিকিৎসক দল আহতদের চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে।

    অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিনা উস্কানিতে পুলিশের ওপর বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। এতে তাদের ১০-১২ জন সদস্য আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, মতিঝিল বিভাগের ডিসি আনোয়ার হোসেনসহ উর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। ডিসি আনোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিল। হঠাৎ বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। প্রাথমিকভাবে আমাদের ৮-১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাদের দুটি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

    ডিআইজি মনিরুল ইসলাম বলেন, বিনা উসকানিতে ইস্যু তৈরি করার জন্য এটা করেছে ওরা (বিএনপি)। এ ঘটনায় মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের এডিসিসহ ১৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা তা মানেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের দুটি সেডান গাড়ি ও একটি ভ্যানে বিএনপিকর্মীরা হামলা করে এবং পরে দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিএনপি নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার অনুরোধ জানিয়ে মনিরুল বলেন, পুলিশ রাষ্ট্রের কর্মচারী। পুলিশকে প্রতিপক্ষ ভাববেন না।

    জানা গেছে, পুলিশের মতিঝিল জোনের এডিসি শিবলী নোমানসহ প্রায় ১৪ জন আহত হয়েছেন। এরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শিবলী নোমানসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। সন্ধ্যার দিকে তাদের দেখতে হাপসাতালে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। পল্টন থানার ওসি (তদন্ত) কাজী সাইদুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। উর্ধ্বতনদের নির্দেশ ফেলে মামলা করা হবে। সংঘর্ষের ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি বলেও জানান তিনি। তবে থানার ডিউটি অফিসার এসআই সুলতানা বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে ১০-১২ জনকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com