• শিরোনাম

    বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সঙ্গে মহাকাশ যুগে বাংলাদেশ

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ১২ মে ২০১৮

    বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সঙ্গে মহাকাশ যুগে বাংলাদেশ

    স্পেসএক্সের লাইভ ওয়েবকাস্টের মধ্যেই ধারণ করা এক ভিডিওবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হলাম। প্রবেশ করলাম নতুন যুগে। বাংলাদেশের এই স্বপ্নযাত্রা শুরু হল কেনেডি স্পেস সেন্টারের সেই ‘৩৯-এ’ লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকে, যেখান থেকে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যাপোলো-১১’ মহাকাশযানটি মানুষকে পৌঁছে দিয়েছিল চাঁদে।বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গায়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের নকশার ওপর ইংরেজিতে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু ১। বাংলাদেশ সরকারের একটি মনোগ্রামও সেখানে রয়েছে।

    বাংলাদেশ এতদিন বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া করে সম্প্রচার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে আসছিল, বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে গুণতে হয় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থনীতির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তাই ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিজস্ব যোগাযোগ স্যাটেলাইট কাজ শুরু করার পর  বাংলাদেশ ভাড়া স্যাটেলাইটের নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে বলে সরকার আশা করছে মানুষের মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে এই উৎক্ষেপণ চিহ্নিত হয়ে থাকবে পুনঃব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন-৯ রকেটের নতুন সংস্করণের প্রথম সফল উৎক্ষেপণ হিসেবেও। ব্লক ফাইভের এই সফল যাত্রার ওপর ভর করেই মঙ্গল অভিযানের স্বপ্ন দেখছে স্পেসএক্স।

    ভূমি থেকে কক্ষপথ

    উৎক্ষেপণের দেড় মিনিটের মাথায় ফ্যালকন-৯ ম্যাক্স কিউ অতিক্রম করে। নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে রকেটের স্টেজ-১ খুলে যাওয়ার পর স্টেজ-২ কাজ শুরু করে। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্টেজ-১ এরপর সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে এবং অবতরণ করে আটলান্টিকে ভাসমান ড্রোন শিপে। কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সফলভাবেই কক্ষপথের দিকে যাত্রা করেছে। উৎক্ষেপণের মোটামুটি সাড়ে ৩৩ মিনিটের মাথায় বঙ্গবন্ধু-১ পৌঁছে যায় জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটে। রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাশূন্যে গা ভাসায় বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট।

    কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ বলেন, উৎক্ষেপণ সফল হয়েছে। জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটে স্থাপিত হয়েছে আমাদের স্যাটেলাইট। রকেট থেকে উন্মুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধু-১ এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা। সব মিলিয়ে ৩৬ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মহাকাশের ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে নিজস্ব অরবিটাল স্লটে স্থাপিত হবে এই কৃত্রিম উপগ্রহ।

    তবে অরবিটাল স্লটে স্যাটেলাইটকে বসিয়ে কাজ শুরু করতে সময় লাগবে প্রায় দুই মাস। তখন গাজীপুরের জয়দেবপুর আর রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ার গ্রাউন্ড স্টেশন থেকেই এর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার ওপর ভিত্তি করে কক্ষপথকে চিহ্নিত করা হয় তিনভাবে। এগুলো হল লো আর্থ অরবিট (এলইও), জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিট (জিইও) এবং মিডিয়াম আর্থ অরবিট (এমইও)। সব কাজ শেষে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ হবে ‘জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিটের’ একটি কৃত্রিম উপগ্রহ।

    জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট হল এমন একটি কৃত্রিম উপগ্রহ যেটি নিরক্ষ রেখা বরাবর ওই কক্ষপথে থেকে পৃথিবীকে ২৪ ঘণ্টায় একবার প্রদক্ষিণ করবে। এই প্রদক্ষিণ হবে পৃথিবীর আবর্তনের দিকে, অর্থাৎ পশ্চিম থেকে পূর্বে। ফলে গ্রাউন্ড স্টেশনের সাপেক্ষে উপগ্রহটি থাকবে প্রায় স্থির। এ কারণেই ‘জিওস্টেশনারি’ শব্দটি এসেছে। স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ অথবা মাইক্রোওয়েভ সংকেত আকারে গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে পাঠানো তথ্য (আপ-লিংক) গ্রহণ করবে। ওই সংকেতকে কয়েকগুণ ‘অ্যামপ্লিফাই’ করে আবার তা ফেরত পাঠাবে (ডাউন-লিংক) পৃথিবীতে।

    মহাকাশে স্বপ্নযাত্রা

    বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম দফার উৎক্ষেপণ চেষ্টা কারিগরি কারণে শেষ মুহূর্তে আটকে যাওয়ায় যারা হতাশ হয়েছিলেন, শুক্রবারের সফল উৎক্ষেপণ তাদের আনন্দে ভাসিয়েছে। স্পেসএক্সের ইউটিউব চ্যানেলে এই উৎক্ষেপণের ‘লাইভ  স্ট্রিমিং’ দেখানো হয়। আর  রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভি ওই উৎক্ষেপণ সরাসরি সম্প্রচার করে। টেলিভিশন আর কম্পিউটারে চোখ রেখে ইতিহাসের সাক্ষী হয় রাত জাগা মানুষ।

    এই স্বপ্নযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল এক দশক আগে। বাংলাদেশে টেলি যোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ২০০৮ সালে এ বিষয়ে একটি কমিটি করে। আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর ২০০৯ সালে জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। এরপর নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিটের (আইটিইউ) কাছে ইলেক্ট্রনিক আবেদন দাখিলসহ প্রাথমিক ধাপ শেষ করে বাংলাদেশ। দেশি-বিদেশি সংস্থার সম্পৃক্ততায়, জনবল এবং বাজেট বরাদ্দে এগিয়ে চলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ।

    উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে একনেক সভায় দুই হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ প্রকল্প অনুমোদন পায়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় এক হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া ‘বিডার্স ফাইন্যান্সিং’ এর মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

    এই প্রেক্ষিতে হংক সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সঙ্গে প্রায় একহাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি  হয়  ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। এক দশমিক ৫১ শতাংশ হার সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। স্যাটেলাইট সিস্টেমের নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’। এরপর স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের কোম্পানি তালিস এলিনিয়া স্পেসের সঙ্গে একহাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার চুক্তি করে বিটিআরসি।

    পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্যাটেলাইট বসাতে প্রয়োজন হয় সুনির্দিষ্ট অরবিটাল স্লট। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার সংস্থা ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে এই অরবিটাল স্লট ইজারা নিতে অনুমোদন দেওয়া হয় ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মাঝে স্যাটেলাইটের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ বিসিএসসিএল নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়। এই সংস্থা গঠনে মূলধন হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

    স্যাটেলাইট মহাকাশে কাজ শুরু করার তিন মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিসিএসসিএল। পুঁজিবাজারে এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনার কথাও ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী পলক এক নিবন্ধে বলেছেন, এই যোগাযোগ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মূলত তিন ধরনের সেবা পাওয়া সম্ভব। এগুলো হল- সম্প্রচার, টেলিযোগাযোগ ও ডেটা কমিউনিকেশন।

    বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব টেলিভিশন চ্যানেল এবং রেডিও চালু রয়েছে, সেসব মূলত অন্য কোনো দেশের স্যাটেলাইটে নির্ভর করে সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে, যার ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানের কাছে স্যাটেলাইট সেবা দিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

    ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খলিলুর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ইন্দোনেশিয়ার একদম উপরে। ইন্দোনেশিয়ার পেছন দিকে পুরোটাই সমুদ্র। ইন্দোনেশিয়া থেকে সামনের দিকে যত দেশ আছে যেমন মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর সবই কিন্তু আমাদের কাভারেজে আছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চাকরির নতুন ক্ষেত্র ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলেও মনে করেন এই শিক্ষক।

    নিজস্ব এই স্যাটেলাইট বাংলাদেশে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার। ডাইরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ) পদ্ধতিতে স্যাটেলাইট থেকে সিগনাল গ্রহণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলেও সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচার করা সম্ভব হবে।বিশেষ করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের বিদ্যমান টেরেস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যোগাযোগব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করা যাবে। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ বলেন, সাবমেরিন কেবল সি-মি-উই ৪ এবং সি-মি-উই ৫ যদি কোনো কারণে কাজ না করে তখন বিকল্প যোগাযোগে এই স্যাটেলাইট কাজে আসবে। মহাকাশে স্যাটেলাইটের কার্যকারিতার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল থাকে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মিশনের মেয়াদকাল হবে ১৫ বছর।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com