• শিরোনাম

    ঈদ উপলক্ষে ৩২৬ স্পটে ফুটপাতে চাঁদাবাজি

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৯ আগস্ট ২০১৯

    ঈদ উপলক্ষে ৩২৬ স্পটে ফুটপাতে চাঁদাবাজি

    কোরবানি ঈদের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। এ উপলক্ষে রাজধানীর ৩২৬টি ফুটপাতে চাঁদাবাজি চলছে। ফুটপাতে বসা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজির টাকা যাচ্ছে রাজনৈতিক ক্যাডার ও অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের পকেটে। চাঁদার রেট কম হলেই দোকান ভেঙে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে ঈদ ঘিরে গুলিস্তানসহ অধিকাংশ ফুটপাতই দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের মূল সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। এতে প্রায়ই ঘটছে নানা দুর্ঘটনা।

    জানা গেছে, ঈদ বখশিশের নামে লাইনম্যানরা টাকা নিচ্ছে। লাইনম্যানের নেয়া এ চাঁদার টাকা ভাগ হচ্ছে পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় হকার নেতাদের পকেটে। চাঁদার ভাগে কম পড়লেই ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের দেয়া হয় নানা রকম হুমকি। এর প্রভাব পড়ছে ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করা ক্রেতাদের ওপর। গতকাল ফুটপাত দোকানিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে ফুটপাতে চাঁদাবাজির কেউ অভিযোগ করেননি। চাঁদা নেয়ার অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

    রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদ কেন্দ্র করে লাইনম্যানের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। জাতীয় হকার ফেডারেশনের তথ্য মতে, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ হকার রয়েছে। যারা চৌকি বিছিয়ে শার্ট-প্যান্ট ও অন্য কাপড়-চোপড় বিক্রি করেন, তাদের চাঁদার হার বেশি। তবে যারা ফুটপাতে সবজি, ফল বিক্রি করেন, তাদের চাঁদার হার একটু কম।

    বিভিন্ন ব্যবসায়ী জানান, গুলিস্তান এলাকায় হকারদের দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে। মতিঝিল ও ফার্মগেট এলাকার হকারদের দিতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০, নিউমার্কেট এলাকায় ২৫০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা। এবার ভাসমান হকারদেরও চাঁদা দিতে হচ্ছে চড়া রেটে। তারা দিচ্ছেন ৮০ থেকে ১০০ টাকা। তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য সামগ্রী বিক্রেতাদের এবার চাঁদা দিতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। আদায়কৃত চাঁদার ভাগ লাইনম্যানরা বণ্টন করছে প্রতি রাতে। স্থানীয় নেতা ও উপর মহলকেও চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেন হকাররা।

    রাজধানী সুপার মার্কেট থেকে বেল্টপট্টি এলাকা পর্যন্ত ২০০টি দোকানের লাইনম্যান বাবুল ও বকুল। ওই ফুটপাতের একাধিক দোকানদার জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যায় আগে লাইনম্যানরা ৫০ টাকা করে চাঁদা নিয়ে যেত। কোরবানি ঈদ ঘিরে বাধ্য হয়ে ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এছাড়া বেঁধে দেয়া রেট অনুযায়ী চাঁদা না দিলে দোকান ভেঙে দেয়া হয়।

    জাতীয় হকার ফেডারেশনের নেতারা জানান, ঈদ চাঁদাবাজিতে তারা অতিষ্ঠ। ইতোমধ্যে চাঁদার হার নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় ডিএমপির বিভিন্ন থানার এলাকা থেকে রাতের বেলা হকারদের দোকান গাড়িতে তুলে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কয়েক এলাকায় নতুন নতুন চাঁদাবাজ এসব ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা দাবি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গাড়ির মধ্যে যাদের সঙ্গে বনিবনা হয়েছে, তাদের মাল ফেরত দিয়েছে আর যারা সমঝোতায় আসতে পারেননি, তাদের দোকান চলে যায় মালখানায়।

    একজন লাইনম্যান জানান, তিনি আগে ফুটপাতে হকারি করতেন। তিনি এখন লাইনম্যান। তার কাজ শুধু হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা। এই টাকার ভাগ স্থানীয় নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের সদস্যের মধ্যে বণ্টন করতে হয়। এদিক-সেদিক করলে ধরপাকড় চালানো হয়। তিনি জানান, গুলিস্তানে রাজধানী মার্কেটের সামনে ফুটপাতের লাইনম্যানের নাম সুলতান মিয়া, মতিঝিল এলাকার লাইনম্যান মধুমতি সিনেমা হলের টিকিট ব্ল্যাকার এক যুবলীগ নেতা, যুবলীগ নেতা সাইদ বঙ্গভবন এলাকার লাইনম্যান, ফকিরাপুলে গফুর, দিলকুশায় নুরু মিয়া আর আওয়ামী লীগ অফিসের সামনের অংশে চাঁদা তোলে সালাম। যাত্রাবাড়ীর সাতটি ফুপাতের সর্দার সোনা মিয়া, ফার্মগেট এলাকায় লাইনম্যান শাহ আলম ও আবদুর রাজ্জাক দুলাল। নীলক্ষেত, নিউমার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট ও ঢাকা কলেজের সামনের অংশে নিয়ন্ত্রণ করছে হোসেন মিয়া। মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে জয়নাল ও আয়নাল। বিমানবন্দর এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে আলী।

    চাঁদার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের হাতে

    ফুটপাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় থানার পুলিশ ও ফাঁড়ি। সর্দারের নিয়োগ সরাসরি থানার কর্মকর্তারা দেন বলে হকার সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন। গুলিস্তান-পল্টন এলাকার হকার্স সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, গত বছর ওই এলাকার ২৬টি ফুটপাতের সর্দার ছিল সালাম। চলতি বছর থানার বড় কর্মকর্তারা বদলে যাওয়ায় সর্দার বদলে গেছে। বর্তমান সর্দার হয়েছে বাবুল। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি জানান, প্রশাসনের সহযোগিতায় লাইনম্যানরা হকারদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো চাঁদা আদায় করছে। এ ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেও লাভ হয়নি।

    এদিকে সুরিটোলা থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত রাস্তাটি চলে গেছে ব্যবসায়ী ও গাড়িচালকের দখলে। আর গুলিস্তান থেকে জিপিও মোড় পর্যন্ত ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে গড়ে উঠেছে কাপড়, জুতা, ফলসহ বিভিন্ন ব্যবসায়। এ কারণে গুলিস্তান-সদরঘাট সড়কে যানজট পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নবাবপুর থেকে গুলিস্তান সড়কটির দুইপাশে ফ্যান, ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেশিনারি ব্যবসায়ীদের দখলবাজিতে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। নবাবপুরের এক বাসিন্দা বলেন, রাস্তা দখল করে ব্যবসা করায় কোন গাড়ি এ এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না। গুলিস্তান থেকে এক ব্যবসায়ী জানান, গুলিস্তানে গোলাপশাহ মাজার এলাকা থেকে সিদ্দিকবাজার মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাতে এমনিতেই যেখানে ৮০-৯০টি দোকান বসত, সেখানে এবার ঈদ ঘিরে দোকানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন শতাধিক।

    এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে কোন দোকানদার চাঁদাবাজির অভিযোগ করেননি। যদি পুলিশের বিরুদ্ধে কোন চাঁদা নেয়ার অভিযোগ পায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঈদ সামনে রেখে রাতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা পুলিশের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। যারা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত রয়েছে, তারা যে দলের হোক, তাদের গ্রেফতার করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

    ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে চাঁদাবাজি এখনও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেনি। তিনি বলেন, ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজি ঠেকাতে নানা উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের ধরার চেষ্টা চলছে। চাঁদাবাজির সঙ্গে কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে daynightbd.com