• শিরোনাম

    বাসা থেকে বের হতে না দেওয়ায় দুই নারীকে খুন করে সুরভী

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৪ নভেম্বর ২০১৯

    বাসা থেকে বের হতে না দেওয়ায় দুই নারীকে খুন করে সুরভী

    বাসা থেকে বের না হতে দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম (৬৫) ও গৃহকর্মী দিতিকে (১৬) খুন করে নতুন কাজে যোগ দেওয়া সুরভী আক্তার নাহিদা (১৭)। প্রথমে সে দিতিকে এবং পরে ঘুমিয়ে থাকা আফরোজাকে ছুরিকাঘাতে খুন করে। এরপর গৃহকর্ত্রীর মোবাইল নিয়ে সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে এক রিকশাওয়ালার কাছে মোবাইলটি চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে এভাবেই হত্যার কথা স্বীকার করেছে সুরভী। এই স্বীকারোক্তির সময় তার পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

    গত শুক্রবার (১ নভেম্বর) বিকালে ধানমন্ডিতে নিজ বাসায় খুন হন আফরোজা বেগম ও তার গৃহকর্মী দিতি। এ ঘটনায় পলাতক সুরভীকে গতকাল রবিবার (৩ নভেম্বর) আটক করে পুলিশ। সুরভী ভোলার কালুপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম ওরফে রহিজল মিয়ার মেয়ে। তারা ছয় বোন ও দুই ভাই। সে শেরেবাংলা নগর থানার সামনের একটি বস্তিতে বড় বোন পারভীনের সঙ্গে থাকতো।

    আটকের পর তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবির কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে সুরভীকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, গত শুক্রবার বিকালে সুরভীকে বাসার ফটক থেকে ভেতরে নিয়ে যায় আফরোজার মেয়ের জামাই কাজী মনির উদ্দিন তারিমের ব্যক্তিগত সহকারী আতিকুল হক বাচ্চু। সুরভীকে প্রথমে আফরোজার মেয়ে দিলরুবা সুলতানা রুবার ই-৫ ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়। সেখানে কথাবার্তা শেষে তাকে নেওয়া হয় ডি-৪ ফ্ল্যাটে। সুরভীকে বাসা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান আফরোজা। এ সময় তার স্থায়ী গৃহকর্মী দিতি সঙ্গে ছিল।

    তিনি বলেন, ‘সুরভীকে কাপড় কাঁচতে দেওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া করে। এরপর সে বাসায় যেতে চায়। আফরোজা জানান, বাচ্চু আসার পর যেতে দেওয়া হবে। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। সুরভীকে পরে যেতে বলে আফরোজা তার শোয়ার ঘরে চলে যান। দিতি ঝাড়ু-মোছার কাজ শুরু করে। এরপরও সুরভী কয়েকবার চলে যেতে চায়। দিতি তাকে প্রতিবারই বাধা দেয়। দরজা লক করে দেয়। এতে সুরভী ক্ষিপ্ত হয়।

    ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘দিতি একটি বেডরুম পরিষ্কার করছিল। তখন সুরভী রান্নাঘর থেকে একটি ছুরি নিয়ে তার গলায় আঘাত করে। এতে লুটিয়ে পড়ে দিতি। এরপর নিজের শোয়ার ঘরে শুয়ে থাকা গৃহকর্ত্রী আফরোজাকে পেছন থেকে ছুরি মারে সুরভী। ছুরির আঘাতে তিনি উঠে পড়েন। এরপর তার তলপেটে ছুরি মারে। আফরোজা এরপরও ড্রয়িংরুম পর্যন্ত আসেন। এরপর সুরভী দরজা খুলে বের হয়ে যায়।

    তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সুরভী শ্যামলীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতো। সেখানে শারমীন নামে তার এক বান্ধবী ছিল। তার বিয়ে হয়ে যায়। এরপর গত ১১ অক্টোবর পোশাক কারখানা থেকে বেতন পাওয়ার পর সুরভী চাকরি ছেড়ে দেয়। এতে তার বোন পারভীন ও পরিবারের সদস্যরা রাগারাগি করে। এরপর সে বাসাবাড়িতে কাজ খুঁজতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ অক্টোবর সে ধানমন্ডিতে আসে। এখানে ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাসার সামনে আফরোজা বেগমের মেয়ের জামাই তারিমের ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চুর সঙ্গে তার কথা হয়। বাচ্চু তাকে কাজের ব্যাপারে পরে জানাবেন বলে জানান। বাচ্চুর মোবাইল নম্বর নিয়ে ওইদিন সুরভী চলে যায়। এরপর বাচ্চুর সঙ্গে যোগাযোগ করে ১ নভেম্বর সে ওই বাসায় আসে।

    আফরোজা ও দিতিকে হত্যার পর সুরভী প্রথমে বড় বোন পারভীনের কাছে যায়। তবে তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। একবার সে অচেতনও হয়ে পড়ে। পারভীন  বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছিলাম সে (সুরভী) একটা কিছু করে আসছে। তাকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল না। এর কিছুক্ষণ পর আমার মেজো বোন কুলসুমের ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে একের পর এক ফোন আসতেছিল। সবাই ফোন দিয়ে একটা মেয়েকে খোঁজে।’

    সুরভীর বোন কুলসুম বলেন, ‘আমি বিদেশ যেতে মেডিক্যাল করানোর জন্য গত ১৫ অক্টোবর ঢাকায় এসেছি। ঢাকায় এসে বড় বোন পারভীনের বাসায় উঠেছি। আমি আসার পর থেকে আমার মোবাইল ফোন সুরভী ব্যবহার করে। কথাবার্তা বলে। ঘটনার দিন সে আমার মোবাইল ফোন নিয়ে বের হয়েছে।

    তিনি বলেন, ‘ধানমন্ডিতে সে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা আমরা প্রথমে আঁচ করতে পারিনি। পরে আমার মোবাইলে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। সবাই জিজ্ঞাস করে ওই মেয়েটি কই। কিন্তু কেউ নাম বলে না। আমি সবাইকে বলছি, আমি একজন মহিলা, আমি মেয়ে না। আমার বাচ্চা আছে। তারপরও ফোন আসতে থাকে। এরপর আমি আমার মোবাইল ফোনটা আমার স্বামীকে দেই। সেও ফোন রিসিভি করে সবাইকে বলে, এটা আমার স্ত্রীর নম্বর, রং নম্বরে ফোন দিচ্ছেন। আর ফোন দিবেন না। এরপর বাচ্চু নামে এক লোক ফোন দিয়ে বলে, ওই মেয়েটা আমার চাচিকে এবং কাজের মেয়েকে খুন করে গেছে। তখন আমি ভয়ে মোবাইল থেকে সিমটি খুলে রাখি।

    কুলসুম আরও বলেন, ‘সুরভী বাসা থেকে পালিয়ে আমাদের খালাতো বোনের বাসা মিরপুরে চলে যায়। আমরাও ভয়ে বাসা থেকে চলে যাই। এরপর আমাদের এক খালাতো ভাই বলে, তোরা এভাবে বাঁচতে পারবি না, সুরভীকে পুলিশে দিয়ে দে। তখন আমরা ওকে পুলিশে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এরমধ্যে পুলিশ আমাদের সন্ধান পেয়ে যায়। আমাদের সবাইকে ধরে ফেলে।’সুরভীর চার বোন ঢাকায় থাকেন। এক বোন বিদেশ থাকেন। এক বোন, দুই ভাই ও মা-বাবা বাড়িতে থাকেন।

    বড় বোন পারভীন জানান, সুরভীর বান্ধবী শারমিনের স্বামী চাইতো না সুরভী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুক। এ নিয়ে শারমিনের স্বামী তাদের কাছে অভিযোগও করেন। এ বিষয়ে সুরভীকে একদিন মারধরও করেন তাদের বাবা। এসব নিয়ে তাদের পারিবারিক ঝামেলা ছিল। গ্রেফতার হওয়ার পরদিন ডিবি পুলিশের কাছে সব স্বীকার করেছে সুরভী। তবে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সে অনুতপ্ত নয়। সুরভীকে গ্রেফতারের পর পুলিশ সুরভীর বাবা, বোন ও বোন জামাই সবাইকে আটক করে ডিবিতে নিয়ে আসা হয়। তবে পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

    মেয়ের এমন নিষ্ঠুরতায় বাবা রফিকুল ইসলাম হতবাক। তিনি বলেন, ‘এত নিষ্ঠুর হলো মেয়ে কীভাবে! ওর রাগ বেশি জানি। আমাকেও একবার মেরেছিল! তবে এরকম করতে পারে, তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। পুলিশের কাছে সুরভী সবই স্বীকার পেয়েছে আমাদের সামনে। আমাদেরও বলছে। আমি চাই বিচার হোক।

    এই জোড়া খুনের ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় নিহত আফরোজা বেগমের মেয়ে দিলরুবা সুলতানা রুবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলাটি ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। মামলায় আতিকুল হক বাচ্চু, বাড়িটির কেয়ারটেকার নুরুজ্জামান, কেয়ারটেকার বেলায়েত, ইলেক্ট্রিশিয়ান প্রিন্স এবং অজ্ঞাতনামা নতুন গৃহকর্মীকে (সুরভী) আসামি করা হয়েছে।

    ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে সুরভী হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এখনও আর কারও সম্পৃক্ততার কথা সে জানায়নি। তাকে রিমান্ডে এনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ তিনি বলেন, সুরভী একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে daynightbd.com