• শিরোনাম

    বুড়িগঙ্গায় লঞ্চের ধাক্কায় লঞ্চডুবি

    ৩২ মরদেহ উদ্ধার: মাঝ নদীতে স্বজনদের আহাজারি

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৯ জুন ২০২০

    ৩২ মরদেহ উদ্ধার: মাঝ নদীতে স্বজনদের আহাজারি

    বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চের ধাক্কায় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে একটি লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে এমএল মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। সদরঘাটের কাছেই ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকায় নদীতে চাঁদপুরগামী ময়‚রপঙ্খী-২ লঞ্চের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে যায়। লঞ্চডুবির পরপরই ডুবে যাওয়া যাত্রীদের উদ্ধার করতে নামে ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ, নৌবাহিনী, বিআইডব্লিউটিএ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ডুবুরিরা। উদ্ধার অভিযানে ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করা হলেও পরিচয় জানা গেছে ৩০ জনের।

    তারা হলো- সত্যরঞ্জন বণিক (৬৫), মিজানুর রহমান (৩২), শহিদুল (৬১), মনিরুজ্জামান (৪২), গোলাম হোসেন ভুইয়া (৫০), আফজাল শেখ (৪৮), আমির হোসেন (৫৫), সাইম (১৭), শাহাদাৎ (৪৪), শামীম বেপারী (৪৭), মিল্লাত (৩৫), আবু তাহের (৫৮), দিদার হোসেন (৪৫), সুমন তালুকদার (৩৫), আলম বেপারী (৩৮), সহিদুর (৪০) তালহা (০২), ইসমাইল শরীফ (৩৫), সাইদুল ইসলাম, তামিম, সুফিয়া বেগম (৫০), সুবর্ণা আক্তার (২৮), মুক্তা (১২), বিউটি (৩৮), ময়না (৩৫), হাফেজা খাতুন (৩৮), আয়না বেগম (৩৫), হাসিনা রহমান (৪০), মোসা. মারুফা (২৮) ও সুমনা আক্তার।

    প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ সকাল ৯টার দিকে মুন্সিগঞ্জ থেকে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে দোতলা মর্নিং বার্ড লঞ্চটি। সদরঘাটের কাছেই ফরাশগঞ্জ ঘাটে পৌঁছে ভেড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো লঞ্চটি। আর ভোরে চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূরপঙ্খী-২ লঞ্চটি লালকুঠী ঘাটে যাত্রী নামিয়ে সদরঘাটের চাঁদপুর ঘাটে গিয়ে নোঙ্গর করার জন্য ব্যাক গিয়ারে ঘুরছিল।

    ওই সময় পেছনে থাকা মর্নিং বার্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক ছোট মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। লঞ্চে থাকা অনেক যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকে ডুবন্ত লঞ্চে আটকা পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে একে একে ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ডসহ সংশিøষ্ট সংস্থার ডুবুরিরা।

    দুর্ঘটনার পর হাজার হাজার মানুষ ঘাটে এসে ভিড় করেন। মর্নিং বার্ডের নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে ঘাটে আসা স্বাজনরা বিলাপ করতে থাকেন। ছোট ছোট নৌকা ভাড়া করে স্বজনরা ডুবে যাওয়া স্থানে ভীড় করেন। উদ্ধারকর্মীরা বেশ কয়েকটি লাশ উদ্ধারের পর তা চিহ্নিত করতে ছুটে যান স্বজনরা। সরকারি উদ্ধার সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন।

    বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক জানান, ময়‚র-২ নামের একটি লঞ্চ সদরঘাট লালপট্টি থেকে চাঁদপুরের দিকে যাচ্ছিল। ওই লঞ্চটি মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়। এতে মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি ডুবে যায়। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, দুই লঞ্চের চালকের গাফলতি ছিল।

    ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ডুবুরিরা উদ্ধারকাজ শুরুর পরপরই ১৪ জনের লাশ উদ্ধার করে আনা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৬। এরপর রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। আবারও কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ল লাশের মিছিল। তুলে আনা হলো আরও ৯টি লাশ। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সদরঘাটে লঞ্চডুবির ঘটনায় এভাবে বাড়তে থাকে লাশের মিছিল। এভাবে গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত মোট ৩২ টি নিষ্প্রাণ দেহ উদ্ধার করা হয়।

    বেলা ১১টার দিকে উদ্ধার করা লাশের মধ্যে কেউ কেউ প্রিয়জনের লাশ শনাক্ত করতে পেরেছেন। তবে বেশিরভাগই তখনো স্বজনদের লাশ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ অবস্থায় বুড়িগঙ্গা নদীর দুই তীরে কেউ প্রিয়জনের লাশ পেয়ে কাঁদছেন আবার কেউ স্বজনের মুখটি দেখতে না পেয়ে কাঁদছিলেন। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে বুড়িগঙ্গা নদী। যারা সাঁতার কেটে তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের জন্য ছুটে আসা প্রিয়জনরা হাসি মুখে ফিরছেন। তবে লঞ্চের যাত্রীদের বড় অংশই তীরে উঠতে সক্ষম হননি।

    ভাগিনার জন্য মুন্সীগঞ্জ থেকে ছুটে আসেন শাকিল। দুপুরের দিকে ভাগিনাকে মৃত অবস্থায় পান। কান্নারত অবস্থায় তিনি বলেন, আমার ভাগিনা নিয়মিত মুন্সীগঞ্জ থেকে ইসলামপুরে আসতেন। আজকের লঞ্চ দুর্ঘটনায় সে মারা গেছে।

    ভগ্নিপতির লাশের জন্য পাগলপ্রায় ষাটোর্ধ্ব নারায়ণগঞ্জের মো. সেলিম। তিনি বলেন, তার ভগ্নিপতির নাম মনির হোসেন। বয়স ৫০ বছরের মতো হবে। লঞ্চে করে তিনি ঢাকায় আসছিলেন। লঞ্চ ডুবির পর থেকে তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। সকাল থেকে তার ফোন বন্ধ। এভাবে নিখোঁজদের জন্য নদীর তীরে অপেক্ষা করতে থাকেন তাদের স্বজনরা। অবশেষে কেউ জীবিত ফিরে পান, কেউ মৃত অবস্থায়।

    ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সদরঘাটের চতুর্দিকে কান্নার রোল। নদীতে ডুবুরিরা নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে। আর তীরে বসে নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় বসে বসে কাঁদছেন স্বজনরা। যেখানে লঞ্চটি ডুবেছে, তার উপরে নৌকা নিয়ে অবস্থান করে মরদেহ উদ্ধার করছে ফায়ার সার্ভিস। উদ্ধারের পর মরদেহ মাঝ নদীতেই ফায়ার সার্ভিসের একটি বড় নৌকায় রাখা হচ্ছে।

    ফায়ার সার্ভিসের সেই বড় নৌকার চারপাশে ছোট ছোট নৌকা ভিড় করেছে। এ অবস্থায় ফায়ার সার্ভিস মাইক দিয়ে বারবার বলছে, আপনারা সরে যান। আপনাদের নৌকার নিচে আমাদের ১৬ জন ডুবুরি কাজ করছেন। তাদের উপরে উঠতে সমস্যা হচ্ছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের মাইকিং না শুনে নৌকার চারদিকে কান্নাকাটি করছেন স্বজনরা।

    লঞ্চে নিখোঁজদের স্বজনরা তাদের প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত করতে বা খুঁজে পেতে এখানে অবস্থান করছেন। কেউ ভাইকে খুঁজতে আসছেন, কেউ ছেলেকে কেউবা বাবাকে খুঁজে ফিরছেন। কিন্তু দুই/একজন ছাড়া অন্যরা তখনো স্বজনদের মৃত কিংবা জীবিত সন্ধান পাচ্ছিলেন না। পরে লাশগুলো নেয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান নিখোঁজদের স্বজনরা। চিহ্ন-বর্ণ দিয়ে অনেকেই নিয়ে যান আপনজনের মরদেহ।

    ফরাশগঞ্জ ঘাটের ডগের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ৪১ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, ময়ূর-২ লঞ্চটি খুব গতিতে ব্যাক গিয়ারে যাচ্ছে। এর পেছনেই রয়েছে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি। ময়‚র-২ লঞ্চটি পেছনের অংশ দিয়ে মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে অনেকটা ঠেলে নিয়ে যায়। কিছুদূর যাওয়ার পর মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সোজাসুজি থেকে এলোপাথাড়ি হয়ে যায়। আর তখনি ময়ূর-২ লঞ্চের পেছনের অংশ মর্নিং বার্ডের ওপরে উঠে যায়। এতে পুরো লঞ্চটি ডুবে যায়।

    ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় মো. মাসুদ নামের যাত্রীকে। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ঘাটে ভেড়ার জন্য আমাদের লঞ্চ (মর্নিং বার্ড) সোজা আসছিল। অন্য একটা লঞ্চ ত্যাছড়াভাবে (বাঁকা) রওনা দিয়েছে। ত্যাছড়াভাবে রওনা দেয়াতে ওই লঞ্চটা ধাক্কা দিয়েছে আমাদের লঞ্চের মাঝে। ধাক্কা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটা কাইত হয়ে ডুবে গেছে।

    পানির তলায় যেতে ১০ সেকেন্ডও সময় নেয়নি। নিজের অবস্থান বর্ণনা দিয়ে ওই যাত্রী বলেন, আমি কেবিনে ছিলাম। গ্লাস খুলে আমি বের হইছি। ভেতরে আমার আপন দুই মামা ছিলেন। তারা তো বের হতে পারেননি। দুই মামার খোঁজে সদরঘাটের জেটিতে অবস্থান করেন মাসুদ। পরে তার এক মামা আফজাল শেখকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

    বিআইডব্লিউটিএ’র হয়ে কাজ করছেন ডুবুরি জাহাঙ্গীর আলম শিকদার। ৯টি মরদেহ লঞ্চ থেকে উদ্ধার করেছেন তিনি। তিনি জানান, আমি সকাল ১০টার দিকে খবর পেয়ে এখানে আসি। এসে দেখি ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ড্রাইভে রয়েছে। আমাকে তারা কাজ করতে বললো। এরপর আমি নামলাম। লঞ্চটি ৬০-৭০ ফুট পানির নিচে কাত হয়ে রয়েছে। একটু তল্লাশি করার পরই দু’টি মরদেহ পেলাম। এরপর আবার যখন যাই তখন দেখি লঞ্চটি উপুড় হয়ে আছে। এরপর একে একে শিশুসহ আরও সাতটি মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসি। এরমধ্যে দু’জন নারী রয়েছে।

    আরেক বেসরকারি ডুবুরি মো. কালু ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি বলেন, পানির নিচে লঞ্চটি উপুড় হয়ে আছে। আমি দু’টি লাশ লঞ্চের বাইরে পেয়েছি। ধারণা করছি, কিছু লাশ হয়তো বের হয়েছে।

    ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার শহীদুল ইসলাম সুমনা ঘটনাস্থলে লাশ গ্রহণ ও লাশ তীরে হস্থান্তরর করছেন। তিনি বলেন, আমাদের ডুবুরিরা কাজ করেছেন। সব প্রতিষ্ঠান মিলে কাজ করেছি। তবে তখনো বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছাতে পারিনি। জাহাজটি পোস্তগোলা ব্রিজের কাছ পর্যন্ত এসে আর আসতে পারছিল না।

    এদিকে ঠিক কতজন যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ডুবেছে, বিষয়টি কেউই নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, আনুমানিক ৫০ জন যাত্রী লঞ্চটিতে ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর কিছু যাত্রী সাঁতরে নদীর কিনারে উঠতে সক্ষম হন। তবে বেশিরভাগই উঠতে পারেননি। কতজন উঠতে পারেননি তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো কর্তৃপক্ষ।

    বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফউদ্দিন জানান, ধাক্কা দেওয়া লঞ্চ ময়‚র-২ জব্দ করা হয়েছে। তবে লঞ্চের চালক পালিয়ে গেছেন।

    নিহতদের অনুদান ও তদন্ত কমিটি গঠন: এদিকে মৃত পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ। এছাড়া লাশ দাফনের জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

    তিনি জানান, এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয় হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (উন্নয়ন ও পিপিপি সেল) মো. রফিকুল ইসলাম খান। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিসের পÿ থেকেও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

    র্সবশেষ  আজ রাত ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিস সদর দফতর কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার লিমা খানম জানান, এ পর্যন্ত মোট ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত একজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। মৃতদের মধ্যে পুরুষ ২১ জন, নারী ৮ জন এবং ৩ জন শিশু। বাকি দুজনের বিষয়ে এখনও জানা যায়নি।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com