• শিরোনাম

    পাহাড়ে সংঘাতে ২২ মাসে ৩৩ খুন

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ অক্টোবর ২০২০

    পাহাড়ে সংঘাতে ২২ মাসে ৩৩ খুন

    পাহাড়ে দিন দিন বাড়ছে সংঘাত। প্রতিনিয়ত রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে সবুজ পাহাড়। খুন হচ্ছে একের পর এক। দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি থেকে পার্বত্য এলাকায় গত ২২ মাসে ৩৩ নারী-পুরুষ খুন হয়েছেন। এ বছরের ২৫ মার্চ থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত খুন হয়েছেন ১৬ জন। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সরকার শান্তিচুক্তি করলেও এখনও অশান্ত পার্বত্যাঞ্চল। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতাদের ব্যক্তি স্বার্থের কারণেই খুনোখুনি লেগেই আছে।

    সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাঙামাটির নানিয়ারচরে সেনাবাহিনীর একটি টহল দলের ওপর সশস্ত্র হামলায় এক সেনা সদস্য আহত হওয়ার পর পাল্টা হামলায় হামলাকারীদের দু’জন নিহত হয়েছে। নিহত দু’জনই ইউপিডিএফ-এর কর্মী। ঘটনাস্থল থেকে একটি একে-২২ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

    পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ‘সেনাবাহিনীর একটি টহল দলের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। তখন একজন সেনা সদস্য আহত এবং দু’জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে বলে জেনেছি আমরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে।’

    ১৯৭৬ সালে বরকল উপজেলায় টহল পুলিশের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এই সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন। সংগঠনটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য বিশ্বস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব না থাকায় সশস্ত্র আন্দোলন এক পর্যায়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার অপতৎপরতা রুখতে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই তৎকালীন সরকার সমতল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভূমিহীন এবং দরিদ্র বাঙালিকে পুনর্বাসন করে পার্বত্য অঞ্চলে। এতে করে বিচ্ছিন্নতার তৎপরতা কমলেও জটিল আকার ধারণ করে ভূমি বিরোধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য, চাঁদাবাজি এবং কৌশলে ভূমি দখলের বিষয়গুলো।

    পাহাড়ে সংঘাতের নেপথ্যে
    পাহাড়ে আঞ্চলিক চারটি দল থাকলেও তারা দুই ভাগে বিভক্ত। চুক্তির পক্ষের সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং চুক্তিবিরোধী প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এখন এক হয়ে কাজ করছে। সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বাধীন জেএসএস (এমএন লারমা) এবং শ্যামল কান্তি চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ’কে (গণতান্ত্রিক) এক হয়ে কাজ করছে বলে এলাকাবাসী মনে করে।

    দুই দশক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সই হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার সঙ্গে এই চুক্তি সই হয়। খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে প্রায় ২ হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন সন্তু লারমা।

    তবে ওই চুক্তির বিরোধিতা করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামেই কালো পতাকা প্রদর্শন করে জনসংহতি সমিতির সহযোগী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের একটি অংশ। চুক্তি বিরোধিতা করে সন্তু লারমার সংগঠন থেকে বের হয়ে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। ১৯৯৮ সালের ২৬ জুন ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা আত্মপ্রকাশ করে।

    ২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নানা অভিযোগে সুধাসিন্ধু খীসা ও তারিন্দ্র লাল চাকমার (পেলে) নেতৃত্বে জন্ম হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে পাহাড়ে আরেক নতুন সংগঠন। সর্বশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে খাগড়াছড়িতে সাংবাদিক সম্মেলন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামের নতুন সংগঠন জন্ম নেয়। এ নিয়ে এখন পাহাড়ে চারটি আঞ্চলিক দলের তৎপরতা রয়েছে।

    চুক্তিবিরোধী সংগঠন হিসেবে পরিচিত ইউপিডিএফে কেন্দ্রীয় কমিটির যুব ফোরামের সভাপতি অংগ্য মারমা বলেন, ‘এটি অসম্পূর্ণ চুক্তি, সেই কারণে আমরা চুক্তির বিপক্ষে ছিলাম। এই অসম্পূর্ণ চুক্তিটি সরকার দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখেছে এবং তারা বাস্তবায়নও করছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষকে অধিকার দেওয়া হলে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত হতো না। চুক্তি নিয়ে আমাদের চার দলের মধ্যে একটি প্রতিশ্রুতি হয়েছিল কেউ আর হানাহানির মধ্যে জড়াবে না। কিন্তু সেটি স্থায়ী হয়নি। শাসক গোষ্ঠীর কারণে পাহাড়ে সংঘাত বন্ধ হচ্ছে না। এই সংঘাত বন্ধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার চাইলেই এই সংঘাত বন্ধ হতে পারে।’

    ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা বলেন, ‘প্রসীত খীসার ইউপিডিএফের জন্য আজ পাহাড়ে এত সংঘাত। তারা তখন চুক্তির বিরোধিতা না করলে হয়তো পাহাড়ে আজ চারটি আঞ্চলিক সংগঠন হতো না। পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক এটা আমরা সব সময় চাই। এর জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু সন্তু লারমার জেএসএস ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফের কারণে এটি বন্ধ হচ্ছে না। তারা মুখে হানাহানি বন্ধের কথা বললেও সাধারণ পাহাড়িরা তাদের কথা বিশ্বাস করে না। তরা উভয়ে বিশ্বাস ঘাতক।’

    পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) দলের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ে কোনও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের দল জড়িত ছিল না। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে যাদের বেশি ক্ষতি হবে তারাই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে। আমরাও চাই পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান থাকুক। সবাই নিরাপদে শান্তিতে বসবাস করুক।’

    সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস কয়েক বছর ধরে দলের কোনও নেতাকর্মী গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছে না। তবে প্রতি মাসে দলীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিবৃতি দেয় তারা। ১৩ অক্টোবর তাদের পেজে সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আগের মতো সেপ্টেম্বরেও পাহাড়ে নারীর ওপর সহিংসতা থেমে থাকেনি। বিশেষ করে এ মাসের শেষের দিকে খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় রাতে ঘরের দরজা ভেঙে মানসিক প্রতিবন্ধী এক জুম্ম নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময়ে পুলিশ সদস্য কর্তৃক শিশুসহ ৫ জুম্ম নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

    বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন এক বিস্ফোরন্মুখ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর এবং চুক্তির কিছু ধারা বাস্তবায়নের ফলে জুম্মদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তবে দুই যুগেও সেই চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চুক্তি বিরোধী এবং চুক্তির অন্যতম পক্ষ জনসংহতি সমিতির আন্দোলনকারী নেতাকর্মী ও জনগণের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের কারণে জুম্ম জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম ক্ষোভ ও হতাশা। ফলে যেকোনও মুহূর্তে জনগণের প্রতিরোধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে পাহাড় আগের রূপে ফিরে যেতে পারে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    বে-রসিক ইউএনও!

    ১২ মার্চ ২০১৭

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে daynightbd.com