• শিরোনাম

    অবৈধ অস্ত্র, গুলি, মদ, ওয়াকিটকি-হাতকড়া উদ্ধার

    ইরফান সেলিম ও দেহরক্ষী গ্রেফতার, ১ বছর করে কারাদন্ড

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৬ অক্টোবর ২০২০

    ইরফান সেলিম ও দেহরক্ষী গ্রেফতার, ১ বছর করে কারাদন্ড

    নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের মামলায় ঢাকা-৭ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মো. জাহিদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজ সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খান।

    মামলা দায়েরের পর সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাটের দেবদাস লেনে হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষীকে গ্রেফতার দেখায় র‌্যাব। অভিযানে ইরফান সেলিমের কক্ষ থেকে অবৈধ অস্ত্র, গুলি, মদ, ওয়াকিটকি-হাতকড়া উদ্ধার করা হয়েছে। পরে র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত অবৈধ ওয়াকিটকি ও মদ রাখায় ৬ মাস করে মোট এক বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করেছে দুজনকে। এছাড়া অস্ত্র ও মাদক রাখায় দুজনের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হবে জানিয়েছেন র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

    অভিযান শেষে আজ সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিলøাহ বলেন, মাদক ও অবৈধভাবে ওয়াকিটকি রাখার অপরাধে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদকে এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন।

    আর হাজী সেলিমের বাড়ি থেকে উদ্ধার অস্ত্র ও মাদকের ঘটনায় র‌্যাব বাদী হয়ে দুটি মামলা করবে। এরপর তাদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হবে। তিনি বলেন, কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ও আলামতের ভিত্তিতে আমরা আমাদের অভিযান পরিচালনা করেছি। আমরা অভিযান পরিচালনা করার পর আমরা সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। অভিযানের সময় হাজী সেলিম বাসায় ছিলেন না।

    এর আগে হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, মদ, বিয়ার ও ওয়াকিটকিসহ বিপুল পরিমাণ নিরাপত্তা সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে র‌্যাব। আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় অভিযান শুরু করে র‌্যাব। অভিযান চলে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।

    র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেত্বত্বে ও র‌্যাব-১০ এর সহযোগিতায় বিপুল সংখ্যক র‌্যাব সদস্য হাজি সেলিমের বাসায় অভিযান চালায়। এর আগে দুপুর থেকে বাসাটি ঘিরে রাখেন র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। দুপুরের পর র‌্যাবের অভিযানিক দল বাসায় প্রবেশ করেন। অভিযানের শুরুতে ইরফান ও তার দেহরক্ষীকে হেফাজতে নেয় র‌্যাব। এরপর অভিযোগকারীর (নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ) অভিযোগের বিষয়ে তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অন্যদিকে পুরো বাড়িতে অভিযানও চলতে থাকে।

    সরেজমিনে দেখা গেছে, চকবাজারের ২৬ নম্বর দেবীদাস ঘাট লেনের ওই বাড়ির চতুর্থ ও পঞ্চম তলাটি ডুপ্লেক্স সিস্টেমে নির্মাণ করা হয়েছে। ৪র্থ তলার উত্তর কর্ণারের রুমটিতে বসবাস করতেন এমপি পুত্র ইরফান সেলিম। তার রুমের তোশকের নিচে ম্যাগজিন ভর্তি একটি বিদেশী পিস্তল পাওয়া গেছে। এছাড়া ৫ম তলায় পূর্ব পাশের কর্নারে ৫টি ওয়ারল্যাস এবিএস সিস্টেম ও ৩৮টি ওয়াকিটকি সেট, একটি হ্যান্ডকাপ, একটি বন্দুক, বিদেশী মদের বোতল ও বিয়ার মদ পাওয়া গেছে। আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো লাইসেন্স নেই। আর ওয়াকিটকিগুলোও অবৈধ, কালো রঙের এসব ওয়াকিটকি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করতে পারেন।

    দেখা যায়, পুরান ঢাকা এলাকা ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করতে হাজী সেলিমের বাসায় গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিসহ অত্যাধুনিক কন্ট্রোল রুম। কন্ট্রোল রুমে রয়েছে আধুনিক ভিপিএস (ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার), ৩৮টি ওয়াকিটকি, ড্রোনসহ বিভিন্ন ডিভাইস। রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিভিআইপি) নিরাপত্তায় নিয়োজিত এলিট বাহিনীর কাছে যেসব সরঞ্জাম থাকে, সেরকম সরঞ্জাম পাওয়া গেছে এখানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় এই কন্ট্রোল রুম ব্যবহার করা হতো বলে র‌্যাবের ধারণা।

    ‘কন্ট্রোল রুমের’ বিষয়ে র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলেন, হাজী সেলিমের আট তলা ভবনের তিন ও চার তলা থেকে এসব সরঞ্জামসহ তারা অবৈধ একটি বিদেশি পিস্তল ও একনলা বন্দুক জব্দ করেছেন। কালো ৩৮টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ওয়াকিটকির প্রতিটি চার কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা কাভার করতো। এ ধরনের ওয়াকিটকি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করা নিষেধ।

    কর্মকর্তারা জানান, এছাড়া ওই বাসায় একটি ড্রোন, রাউটার, একটি ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার বা ভিপিএস পাওয়া গেছে। এই ভিপিএস দিয়ে মূলত তার পুরো নেটওয়ার্কে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতো, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ট্র্যাক করতে না পারে। সাধারণত ভিপিএস ব্যবহারের অনুমোদন পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা নিরাপত্তায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থা। বিটিআরসি এই অনুমোদন দেয়। তবে হাজী সেলিম কোনো অনুমোদন নেননি। এক জোড়া হ্যান্ডকাফও উদ্ধার করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের ধারণা, এই হ্যান্ডকাফ পরিয়ে হাজী সেলিমের লোকজন র‌্যাব ও ডিবি পরিচয় দিয়ে মানুষকে ধরে নিয়ে যেত।

    অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, উদ্ধার করা ওয়াকিটকির মাধ্যমে ইরফান সেলিম তার বাসার আশপাশের পাঁচ থেকে ১২ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা নেতাকর্মী ও অনুসারীদের সঙ্গে কথাবার্তা এবং যোগাযোগ রাখতেন। এছাড়া তার বাসার চার ও পাঁচতলার কন্ট্রোল রুম থেকে পাঁচটি ভিপিএস সেট উদ্ধার করা হয়েছে। যেগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ডিটেক করতে পারতো না। একটি ড্রোনও উদ্ধার করা হয়েছে। সারওয়ার আলম বলেন, এসব অস্ত্র ও হ্যান্ডকাফের বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এরফান সেলিম। আমাদের ধারণা এগুলো দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাতেন।

    গত রবিবার রাতে ধানমণ্ডি এলাকায় হাজী সেলিমের গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় গতকাল একটি মামলা হয়। তাতে ইরফান সেলিম ছাড়াও হাজী সেলিমের প্রোটোকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপু, মোহাম্মদ জাহিদ ও মিজানুর রহমানের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরো তিনজনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে পথরোধ করে সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর, জখম ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন মামলার বাদী নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট মো. ওয়াসিফ আহমেদ খান। মামলা হওয়ার পরপরই গাড়ির চালক মিজানুর রহমানকে পুলিশ গ্রেফতার করে আজই একদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

    মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ রবিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে কলাবাগানের দিকে যাচ্ছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি কালো রঙের ল্যান্ড রোভার গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-৫৭৩৬) পেছন থেকে তার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়।

    ওয়াসিফ ও তার স্ত্রী ধাক্কা সামলে মোটরসাইকেল থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ওই গাড়ি থেকে জাহিদ, দিপু এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই-তিনজন ‘অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ’ করতে করতে নেমে আসে এবং মারধর শুরু করে। তারা লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ ও তার স্ত্রীকে ‘উঠিয়ে নেওয়ার এবং হত্যার’ হুমকি দেয় বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।  তবে র‌্যাব গ্রেফতার দুজনের বিরুদ্ধে দুটি আলাদা মামলা করবে বলে জানিয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (আজ রাত ৯টা পর্যন্ত) মামলা করা হয়নি। এবং থানা পুলিশের কাছে হস্থান্তর করেনি র‌্যাব।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com