• শিরোনাম

    বিশ্বের ধনী ব্যক্তি হওয়া ইচ্ছা ছিল আলামিনের

    ১০ মাসে ২২ লাখ গ্রাহকের ২৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৩ নভেম্বর ২০২০

    ১০ মাসে ২২ লাখ গ্রাহকের ২৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ

    বিশ্বের সবচেয়ে ধনি ব্যক্তি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এক যুবক গড়ে তোলে প্রতারণার সিন্ডিকেট। মন্ত্রনালয় থেকে ই-কমার্স ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে শুরু করে অবৈধ মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশসহ ৭০টি দেশে ছড়িয়ে দেয় ব্যবসাটি। এই অল্প সময়ে ৫ লাখ প্রবাসীসহ ২২ লাখ গ্রাহককে যুক্ত করে। যাদের কাছ থেকে ইতোমধ্যে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ২৬৮ কোটি টাকা।

    এই টাকা বৈধ করতে নারায়নগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন জায়গায় কেনা হয় জমি। মোটা অঙ্কের টাকা দেশের বাইরে পাচারের আশঙ্কাও করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চক্রের মূলহোতা আলামিন প্রধানসহ ৬ জনকে গ্রেফতারের পর গতকাল এমনটি জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

    সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ই-কমার্সের নামে লাইসেন্স নেয় চক্রটি। ই-কমার্সের লাইন্সেস নিলেও লাইসেন্সবিহীন ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’ নামের কোম্পানিটি অনলাইনভিত্তিক মাল্টিলেভেল মার্কেটিং করে সাধারণ মানুষকে অধিক কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। মূলত চক্রটি তাদের এমএলএম ব্যবসা আড়াল করার জন্য নামমাত্র কয়েকটি পণ্য যেমন- অ্যালোভেরা শ্যাম্পু, ফেইসওয়াশ, চাল, ডাল, মরিচের গুঁড়া তাদের রেজিস্টার্ড সদস্যদের কাছে বিক্রি করত।

    তার লভ্যাংশ থেকে প্রতি আইডি হোল্ডারকে কোম্পানির বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখার বিনিময়ে ১০ টাকা করে দিতো। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যানুসন্ধানের পর গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর কলাবাগানের এফ হক টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির অফিসে অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে গ্রেফতার করে ডিএমপি’র সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) নাজমুল হকের নেতৃত্বাধীন একটি টিম।

    পরে এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। গ্রেফতার ৪ জনকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত সোমবার রাতে মোহাম্মদপুর থেকে কোম্পানির এমডি ও সিইও মূলহোতা আলামিন প্রধান ও নির্বাহী অফিসার জসিমকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।

    আজই তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে একটি হ্যারিয়ার গাড়ি,দুটি পিকআপভ্যান, সার্ভারে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, রাউটার, দুটি পাসপোর্ট ও কোম্পানির বিভিন্ন কাগজপত্র জব্দ করা হয়। গ্রেফতার বাকি চারজন হলো-কোম্পানিটির ম্যানেজার মো. মানিক মিয়া, ম্যানেজার (প্রোডাকশন) মো. তানভীর আহম্মেদ, সহকারী ম্যানেজার (প্রোডাকশন) মো. পাভেল সরকার ও অফিস সহকারী নাদিম মো. ইয়াসির উল্লাহ।

    আজ মঙ্গলবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, চক্রটি ‘এসপিসি ওয়াল্ড এক্সপ্রেস’ ঠিকানার ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউবে শত শত পোস্টের মাধ্যমে ই-কমার্সের কথা বলে উচ্চমাত্রার কমিশনের লোভ দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। আগ্রহীরা গুগল প্লে-স্টোর থেকে একটি মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করতো। রেজিস্ট্রেশনের সময় বাধ্যতামূলকভাবে আপলিংক আইডির রেফারেন্সে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট (বিকাশ, নগদ, রকেট) নম্বরে প্রতি আইডির জন্য ১২০০ টাকা করে দিতে হতো। গ্রাহকদের দেখানো হতো রেফার কমিশন, জেনারেশন কমিশন, রয়্যাল কমিশনের প্রলোভন।

    এক্ষেত্রেও অবলম্বন করা হতো ডেসটিনির পদ্ধতি। রেফার করা ব্যক্তি তার নিচের ৩টি আইডি থেকে ৪০০ টাকা করে কমিশন লাভ করবে। এরপর ওই তিনটি আইডি থেকে যখন ৩ গুন ৩=৯ আইডি হবে, তখন আপলিংকের আইডি ২০ শতাংশ কমিশন পাবে। এরপর ডাউনলিংকের যত আইডি হবে তার আইডি ১০ শতাংশ হারে কমিশন পাবে। যা মূলত পিরামিড আকৃতির হয়। কিন্তু এ ধরনের ব্যবসা দেশের আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

    তিনি বলেন, মূলহোতা আলামিনের ইচ্ছা ছিল-বিশ্বের ধনী ব্যক্তি হওয়া। সে যেভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল, এভাবে কয়েক মাস চলতে থাকলে তার সেই স্বপ্ন হয়তো পূরণও হতো। কিন্তু তার আগেই পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্যানুসন্ধানের চক্রটিকে ধরে ফেলে। এ সময় সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মীর মোদাসসের হোসেন পর্দায় ছক আকারে বুঝিয়ে দেন কিভাবে চক্রটি টাকা হাতিয়ে নিতো।

    জানা যায়,এইচএসসি পাস করা আলামিন এক সময় ডেসটিনিতে চাকরি করতো। সেখান থেকেই প্রতারণার খুটিনাটি শেখে। ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নেয়। তখন ঠিকমতো খেতেও পারতো না আলামিন। তার এক বন্ধুর কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা ধার নেয়। এর কয়েক মাস পর হ্যারিয়ার গাড়ি হাকিয়ে ওই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যায় আলামিন। রাতারাতি বন্ধুর এ পরিবর্তন দেখে হতবাক হন আলামিনকে টাকা ধার দেয়া সেই বন্ধু।

    প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আলামিন সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগককে জানায়, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার, বন্ধু ইয়াছিন ও নিজের নামে ই-কমার্স ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ডএক্সপ্রেস’ কোম্পানির লাইন্সেস নেয়। প্রশাসন যাতে বুঝতে না পারে এটি এমএলএম ব্যবসা, সেজন্য রেজিস্টার্ড গ্রাহকদের কাছে এসপিসি ব্রান্ডের নামে বিএসটিআই অনুমোদনের সিলযুক্ত বিভিন্ন পণ্য বিক্রি ও অনলাইনে বিজ্ঞাপন সাবমিট করার অপশন রাখা হয় অ্যাপসে।

    দেশীয় ‘আর্টিফিসিয়াল সফট’ নামে একটি আইটি কোম্পানি থেকে তৈরি করা হয় অ্যাপসটি। ভারতীয় আমাজন সার্ভারের মাধ্যমে করা হতো হোস্টিং। যাতে নতুন একাউন্ট খোলা গ্রাহকরা নিয়মিত আপডেট পেতে পারেন। এজন্য আমাজনকে মাসে ৭ হাজার ডলার দিতে হতো। আর গ্রাহকদের কাছ থেকে বিকাশ-নগদ-রকেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া টাকা জমা হতো আলামিনের ৮টি ব্যাংক একাউন্টে। তবে একাউন্টে কি পরিমাণ টাকা রয়েছে তা জানতে পারেনি পুলিশের এই টিম। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা জানার চেষ্টা চলছে। তবে আলামিন জানিয়েছে, একাউন্টে মাত্র ১২ কোটি টাকা জমা রয়েছে। বাকি টাকা দিয়ে নারায়ণগঞ্জ ও সাভারে জমি কিনেছে। আর তার এই অবৈধ ব্যবসা ৭০টি দেশে রয়েছে। যদিও আভিযানিক টিম ১৭টি দেশে এই ব্যবসা থাকার প্রমাণ পেয়েছে।

    ডিএমপির সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) নাজমুল হক বলেন, এই চক্রের বেশ কয়েকজন পলাতক রয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ব্যবসার নামে অ্যাপস ও ওয়েবসাইট ভিত্তিক প্রতারণা ঠেকাতে সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। ইতোমধ্যে এরকম বেশ কয়েকটি কোম্পানির কার্যক্রম নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

    নিঃস্ব শত শত গ্রাহক : ‘এসপিসি ওয়াল্ড এক্সপ্রেস’ কোম্পানিতে শুরুর দিকে ইনভেস্ট করে লাভের মুখ দেখেন অনেকে। তাদের আয়ে প্রলুব্ধ হয়ে শত শত মানুষ শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে ইনভেস্ট করতে থাকেন। যা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন তারা। তেমনই একজন মিরপুরের বাসিন্দা আবু নাসিম। বন্ধুদের মাধ্যমে প্রলুব্ধ হয়ে পৈতৃক ভিটা বন্দুক রেখে ১২০০ টাকা করে প্রায় ৮৩ হাজার টাকায় মোট ৬৯টি আইডি কেনেন। লাভ তো দূরের কথা, সব টাকা হারিয়ে এখন নিঃস্ব আবু নাসিম।

    শুধু নাসিমই নয়; সর্বস্ব বিক্রি করে এ ব্যবসায় আসা হাজারো ব্যক্তি রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। প্রতারকদের উপযুক্ত সাজার পাশাপাশি নিজেদের টাকা ফেরত চেয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তবে আদালতের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডিবি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com