• শিরোনাম

    পঞ্চগড়ের ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৪ মার্চ ২০২১

    পঞ্চগড়ের ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ

    পঞ্চগড়ের এক চেয়ারম্যানকে মুখোশধারী জনপ্রতিনিধি বলে উল্লেখ করে তার হাত থেকে নিজেদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাসহ বাঁচার আর্তি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযুক্ত কুদরত-ই খুদা মিলন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার ১ নম্বর বাংলাবান্দা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্র্যাব) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে এ আর্তি জানান তারা।

    ভুক্তভোগীদের একজন আবদুল হামিদ পেশায় পাথর ও বালু সরবরাহকারী এবং কমিশন এজেন্টের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সংবাদ সম্মেলনে আবদুল হামিদ বলেন, একজন চেয়ারম্যান জনগণের সুখ-দুঃখ দেখভালের কথা থাকলেও মূলত কুদরত-ই খুদা মিলন জনপ্রতিনিধির মুখোশ পরে আইনের ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন। তার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আজ আমরা সুদূর তেতুলিয়া থেকে ঢাকায় এসে আপনাদের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছি।

    হামিদ বলেন, পঞ্চগড়ের ডিসি সাবিনা ইয়াসমিন ও সাবেক এসপি গিয়াস উদ্দিনের কাছে তিনটি করে অভিযোগ, পুলিশের রংপুর বিভাগীয় কমিশনার ও রংপুরের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্যরে কাছে দুটি করে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। শেষমেষ নিরুপায় হয়ে পুলিশ সদর দপ্তরেও আইজিপি’র কমপ্লেইন মনিটরিং সেলে অভিযোগ দিয়েছি।

    আইজিপির পক্ষ থেকে জেলা পুলিশ সুপারকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হলেও পুলিশ সুপার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। মূলত চেয়ারম্যান কুদরত-ই খুদা মিলন নিজেকে এলাকায় ‘ডন’ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের ব্যবহার করে নানা ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

    ২০১৫ সাল থেকে ইউপি চেয়ারম্যান কুদরত-ই খুদা মিলনের হাতে আমি শরীরিক নির্যাতন, চাঁদাবাজিসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়ে আসছি। বর্তমানে আমার (আবদুল হামিদ) মালিকীয় ১৪০ শতাংশ জায়গা (৬৫ শতাংশ দলীলমূলে এবং ৭৫ শতাংশ বায়না সূত্রে) জবরদখল করে রেখেছেন মিলন চেয়ারম্যান। জায়গার তফসিল: জেলা: পঞ্চগড়, থানা: তেঁতুলিয়া, মৌজা: বাংলাবান্ধা, জে.এল নম্বর:১, খতিয়ান নম্বর এস.এ ১০৯, এস.এ দাগ নম্বর ৮৮, জমির পরিমান: ১৪০ শতক।

    একইসঙ্গে আমাকে হয়রানির মধ্যে রাখতে বিভিন্ন লোকজন দিয়ে সাজানো মামলা-মোকদ্দমা করাচ্ছেন মিলন চেয়ারম্যান ও তার সহযোগীরা। এ পর্যন্ত বিভিন্ন লোকজন ও পুলিশকে দিয়ে ইয়াবা কারবার, টাকা পাওনা, ঘর-বাড়িতে আগুন দেয়া, হামলাসহ বিভিন্ন সাজানো অভিযোগে ৯টি মামলা করিয়েছেন। শুরুতে আমাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি দিয়ে তার অপকর্ম শুরু হয়। পরে চাঁদা দিতে না পারায় সম্পত্তি জবরদখলের পাঁয়তারা শুরু করেন চেয়ারম্যান মিলন। চলে নানা ধরনের অমানবিক নির্যাতন।

    হামিদ বলেন, আমার বাড়ি ৭ নম্বর ইউনিয়নে। আমার ব্যবসায়িক কার্যক্রম ৬ নম্বর ভজনপুর ও ১ নম্বর বাংলাবান্দা ইউনিয়নে। ১ নম্বর বাংলাবান্দা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিলন আমাদের কর্মস্থলে এসে এসব নির্যাতন চালাচ্ছেন। ৬ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মকছেদের কাছে বিচার দিয়েও লাভ হয়নি। বরং মিলনের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মকছেদ চেয়ারম্যান, তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শাহীনসহ আরো কিছু মানুষের সামনে সমঝোতা করে ২০১৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছি মিলন চেয়ারম্যানকে। এর দুই মাস পর আবার আমার ব্যবসা বন্ধ করে দেন মিলন। তিনি এভাবে নানা হয়রানির মাধ্যমে এ পর্যন্ত আমার এক কোটি টাকার বেশি ক্ষতি করেছেন এবং এখনো করছেন।

    এই ভুক্তভোগী বলেন, মিলনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলা, মোকদ্দমা কিংবা বিচার দিয়েও কোনো প্রতিকার পাই না। কোন মহাশক্তির বলয়ে তিনি সব কিছু ম্যানেজ করে নেন জানি না।

    সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আরেকজন ভুক্তভোগী জুমার উদ্দিন। এলাকায় কৃষিকাজ করে খেটে খাওয়া এই জুমারও মারাত্মক শারীরিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন মিলন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। পৈত্রিক সূত্রে এবং নিজের কেনা সেখানকার ১০০ শতক (১ একর) সম্পত্তির মালিক জুমার উদ্দিন। তার এই সম্পদের ওপর কুনজর পড়ে মিলন চেয়ারম্যানের। ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্থানীয় সিপাইপাড়া বাজার থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় মিলন চেয়ারম্যানের লোকজন। এরপর মিলন চেয়ারম্যানের চেম্বারে নিয়ে বসায়।

    সেখানে মিলন তাকে কিছু স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেন। এতে জুমার রাজি না হলে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। মিলন চেয়ারম্যানের হুকুমে তার সন্ত্রাসী বাহিনী জুমারকে লোহার রড, বাঁশের লাঠি ইত্যাদি দিয়ে এলোপাথাড়ি দফায় দফায় মারতে থাকে। ধারালো ছুরি দেখিয়ে তাকে বলা হয়, মেরে রাতের মধ্যে মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেবে। মানুষ মনে করবে চুরি করতে গিয়ে ইন্ডিয়ার বিএসএফের হাতে মরেছে। গভীর রাতেও হাত-পা বেঁধে এভাবে দফায় দফায় নির্যাতন চলে। শেষে ছয়টি স্ট্যাম্পে টিপসই দিতে বাধ্য হন জুমার উদ্দিন।

    নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে মিলনের নামে অভিযোগ দিয়েছেন জুমার। এরপর মিলনকে নোটিস করা হলে জুমারের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন মিলন চেয়ারম্যান। এর জের ধরে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে মিলন অস্ত্র-শস্ত্রসহ দলবল নিয়ে জুমারের বাড়িতে যান। সেখানে তার বাড়ির দরজা-বেড়া ভাঙচুর করা হয় এবং তাকে মেরেফেলার জন্য শারীরিক নির্যাতন করে কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলে। প্রাণে রক্ষা পেতে জুমার আর্তচিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে রক্ষা করেন।

    পরে মিলন ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী চলে যায় এবং যাওয়ার সময় অস্ত্র-শস্ত্র উচিয়ে হুমকি দেয়- জুমারকে কখনো একা পেলে মেরেফেলবে, লাশ গুম করবে, ভারত থেকে ফেনসিডিল এনে জুমারের বাড়ি ও দোকানে রেখে মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেবে। প্রয়োজনে নিজেদের বাড়িতে আগুন দিয়ে জুমারের নামে মামলা দিবে বলেও হুমকি দেন তারা। তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনা থানার ওসি আবু সায়েমকে ফোনের মাধ্যমে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।

    এ পর্যন্ত আবদুল হামিদ এসব নির্যাতনের অভিযোগে মিলন চেয়ারম্যান ও তার সহযোগীদের নামে ১৩টা মামলা করেছেন। এর মধ্যে শুধু একটি মামলা থানায় করেছেন বহু কষ্টে। থানায় মিলন চেয়ারম্যানের নামে মামলা নিতে চায় না পুলিশ। এছাড়া জুমার উদ্দিন আদালতে দুটি মামলা করেছেন। আবদুল হামিদের মামলাগুলো বিচারাধীন এবং জুমার উদ্দিনের মামলাগুলো তদন্তাধীন আছে। কিন্তু নির্যাতনও থেমে নেই, বরং বাড়ছে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না। থানায় অভিযোগ দিয়ে মাসের পর মাস চলে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন দেয় না পুলিশ।

    হামিদ ও জুমার ছাড়াও আরো চারজনের (রেহেনা বেগম, আবদুস সাত্তার, ড. জিন্নাত আরা রোকেয়া চৌধুরী ও দবির ইসলাম) প্রায় ১৬ একর ৫৯ শতাংশ জমি মিলন চেয়ারম্যান জবরদখল করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

    জনপ্রতিনিধির মুখোশে মিলন চেয়ারম্যানের চলমান অপকর্মের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

    এ ব্যাপারে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান কুদরত-ই খুদা মিলন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আবদুল হামিদের অভিযোগ মিথ্যা। আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মিলে আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে daynightbd.com