• শিরোনাম

    গা ছমছমে ব্রান ক্যাসেল

    অনলাইন ডেস্ক | ১৩ মার্চ ২০১৭

    গা ছমছমে ব্রান ক্যাসেল

    জাঁকজমকপূর্ণ সৌন্দর্যের নিদর্শন ও ঐতিহ্য বহন করে বিভিন্ন প্রাচীন দুর্গ। সাধারণত, এসব দুর্গ হয় শহর থেকে অনেক দূরে। নজরকাড়া সবুজের সমারোহ দুর্গগুলোকে মানুষের কাছে করে তুলেছে আরো আকর্ষণীয়! সৌন্দর্যের অপর পিঠে থাকে রহস্যময়তা। এই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কত শত দুর্গ। তাদের ঘিরে কত কল্প-কাহিনী, কত ইতিহাস আর কত রহস্যময়তা!
    ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসটি পড়েননি এমন ব্যক্তি বোধহয় খুব কমই আছে। যারা পড়েননি তাদের জন্য গল্পটির সার সংক্ষেপ এরকম: মৃত কাউন্ট ড্রাকুলা দিনের আলোতে কফিনের ভেতর নিথর হয়ে থাকতেন। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠতেন তিনি। তারপর বের হতেন শিকারের খোঁজে। অবশেষে শিকার করা মানুষের গলায় তীক্ষœ দুটি দাঁত বসিয়ে রক্ত চুষে খেতেন। এই হলো গল্পটির সারকথা। এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে রোমানিয়ার ট্রান্সসিলভানিয়ার ব্রান দুর্গ এমনই এক দুর্গ যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ড্রাকুলার গল্প।
    ব্রান হচ্ছে ব্রাসভের একটা উপশহরের মতো ছোট্ট জনপদ, যেখানে প্রবেশের পরপরই পাহাড় চূড়ায় সবুজ বন ঘেরা লাল ছাদের প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন মধ্যযুগীয় সুদৃশ্য দুর্গটি চোখে পড়ে।
    লোকে বলে, রোমানিয়ার কার্পাতিয়ান পর্বতমালার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিসের যেন মন খারাপ করা হু হু বাতাস বয়ে যায় মেঘ করে এলেই। সন্ধ্যা নামার সময়কার যেন চাপা, অস্পষ্ট কান্না ভেসে বেড়ায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কেউ শোনেনি, আবার শুনেছে সবাই। কেননা ট্রানসিলভানিয়া এবং ওয়ালাশিয়ার সীমানায় এক পাহাড়ের চূড়ায় পরিত্যক্ত ব্রান প্রাসাদটিকে ঘিরে ঘুরপাক খায় নানা গল্প, উপকথা, স্থানীয় বিশ্বাস। এমন দুর্গ মধ্য ইউরোপে বিরল কিছু নয়, কিন্তু সেই যে পরিবেশের প্রভাব, একে তো দুর্গম ট্রানসিলভানিয়া তার ওপর আবার খোদ ড্রাকুলার আস্তানা বলে কথা, দেখামাত্রই মনে হলো জানালা দিয়ে কেউ উড়ে বের হলো কিনা ডানা ঝাপটে! বেশ লম্বা লাইন সেই সাত সকালেই দুর্গের সামনে।
    এর দুর্গটি ড্রাকুলার দুর্গ হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে এক ইতিহাস। ১৪৪৮ সালে ওয়ালিসিয়ার যুবরাজ হিসেবে জন্ম নেন তৃতীয় ভøাদ টেপাস। কথিত আছে, তিনি এক অত্যাচারী শাসক ছিলেন। তবে রোমানিয়া বা পূর্ব-ইউরোপের চেয়ে বরং পাশ্চাত্যই ভ্লাদকে এক অতিমাত্রায় নিষ্ঠুর, রক্তপিপাসু শাসক হিসেবে চেনে। বলা হয়ে থাকে অটোম্যান সম্রাট দ্বিতীয় মেহমুদ ভøাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় ভ্লাদের রাজধানীর কাছে এক অঞ্চলে শূলে চরানো ২০,০০০ মৃতদেহ দেখেন, আর এই নিষ্ঠুরতা চাক্ষুস করেই তিনি অসুস্থ বোধ করেছিলেন।
    কিন্তু রোমানিয়ায় ভ্লাদ টেপাসকে একজন দেশপ্রেমী রাজা

    হিসেবেই দেখা হয়। তুর্কি হানাদার এবং অন্যদের থেকে মাতৃভূমি রক্ষা করতেই যে সারা জীবন যুদ্ধ করে গেছে। তবে তার মৃত্যুর কারণ এখনো রহস্যে ঘেরা। তার কবরটি যেখানে পাওয়া যায় সেখানে কোনো মৃতদেহ ছিল না। হয়ত সে থেকেই অমর ভ্লাদের গল্প ডানা মেলা শুরু করে।
    কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা নেই যে এখানে ড্রাকুলাদের আবাস ছিল। আর ড্রাকুলার খ্যাতিমান স্রষ্টা ব্রাম স্টোকার কিন্তু জানতেনও না সেখানের পাহাড়ে ড্রাকুলারা কোনো দিন থেকেছে কিনা। তবে কীভাবে যেন জনশ্রুতি রটে গেছে। সেই বিশ্বাসের জন্যই লোকে দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে যায় সেখানে। তাদের নাকি একটা হাড় হিম করা অনুভূতিও হয়।

    হয়তো এর পিছনে এই গুজবও দায়ী।
    তবে ব্রান প্রাসাদ তৈরির পিছনে এক ইতিহাস রয়েছে যা বেশ ঘটনাবহুল। ৫৭টি রুম এবং ১৬টি বেডরুম, সঙ্গে ইউনিক এন্টিক ফার্নিচার দিয়ে সাজানো এই দুর্গ। ১২১২ সালে টিউটোনিক নাইটরা এটি তৈরি করেছিল। কিন্তু ১২৪৮ সালে মোঙ্গল দস্যুরা এটি প্রায় ধ্বংস করে দেয়। চতুর্দশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ে এটি রোমানিয়ার মানুষের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। মাঝখানের সময়টাও অনেক হাত বদল হয়েছে এর মালিকানা।
    তবে ১৯২০ সালে ট্রানসিলভানিয়া বৃহত্তর রোমানিয়ার অঙ্গ হয়ে যায়। সে সময় শহরের মেয়র প্রস্তাব করেন এটি রোমানিয়ার রাজপ্রাসাদ হওয়া উচিত। তখন রানী মেরির নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশ জুড়ে। প্রথা মেনে এটি হস্তান্তর করা হয় রাজপরিবারের কাছে। আর তখন থেকে রাজপরিবারের সদস্যরা থাকতে শুরু করেন এখানে। রানী মেরির খুব পছন্দের জায়গা ছিল এটি।
    এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। রানী মেরির ছিল এক সুন্দর রূপবতী মেয়ে। নাম তার ইলিয়ানা। রাজকুমারী ইলিয়ানা তখন বড় হচ্ছেন। রাজকুমারী মানেই যে অহঙ্কারী, তা কিন্তু সব সময় সঠিক নয়। এই রাজপ্রাসাদে তিনি আর্ত, অসুস্থ, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত মানুষের সেবার জন্য হাসপাতাল খুলেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে রাজপরিবারকে সরিয়ে কমিউনিস্টরা প্রাসাদটি দখল করে নেয়।
    বর্তমানে এই প্রাসাদকে ঘিরে একটি জাদুঘর আছে। এখানে শুধুমাত্র কুইন মেরির সংগ্রহ করা রাজকীয় আসবাবপত্র এবং রোমানীয় শিল্পকে তুলে ধরা হয়েছে। যে কেউ চাইলে সম্মানির বিনিময়ে তা দেখতে পারেন।
    এখানেই শেষ নয়। রানী মেরির মৃত্যুর পর শুরু হয় আরেক রহস্যময় কাহিনী। ব্রান প্রাসাদকে ঘিরে রোমাঞ্চ ছড়ানোর কারণও আছে। পাহাড়ের নিচে উপত্যকায় ছোট্ট একটি চ্যাপেল বা গ্রোটো রয়েছে। এখানে আছে ভারি অদ্ভুত এক জিনিস। রানী মেরি মারা যাওয়ার সময় বলে যান, তার হৃদপিণ্ডটি যেন একটি সোনার কাসকেটে ভরে কৃষ্ণ সাগরের তীরে ব্যালচিক প্রাসাদের চ্যাপেলে রাখা হয়।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    রাতের রাণীর অন্য জগৎ

    ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে daynightbd.com