• শিরোনাম

    পুলিশে গাইছে যারা দিন বদলের গান

    অগ্রবাণী ডেস্ক | ১৯ মার্চ ২০১৭

    পুলিশে গাইছে যারা দিন বদলের গান

    আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ প্রশ্নের উত্তরে আজকের নারীরা বলতে পারেন, হ্যাঁ, গেছে। কপালে টিপ, হাতে চুড়ি আর খোঁপা সাজিয়ে ঘরে বসে থাকার দিন অনেক পেছনে ফেলে এসেছেন নারীরা। আজ নারীনির্ভর গার্মেন্টস শিল্পের ওপর ভর করে দাড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি। পুলিশের মত বৈচিত্র্যপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীদের সরব উপস্থিতি। স্বীয় মেধা আর যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তারা কর্মক্ষেত্রে রেখে চলেছেন সফলতার স্বাক্ষর।

    প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ পুলিশে যারা গাইছে এমনই দিন বদলের গান তাদের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের তিনজন নারী পুলিশ সদস্যকে নিয়ে প্রতিবেদন করেছে ডিএমপি নিউজ। তিন নারী জানিয়েছেন এ পেশায় আসার পথে সৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতা ও তা কাটিয়ে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

    লুৎফা বেগম

    সপ্তাহের সাতদিন আমি হলাম বৃহস্পতি। পরিবারের কততম সন্তান জিজ্ঞেস করতেই এমন চটপট উত্তর। বুঝে নিলাম সে বাবা-মায়ের ৬ষ্ঠ সন্তান। বুদ্ধিদীপ্ত এমন উত্তরকর্তা হল লুৎফা বেগম। সে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে নারী কনস্টবল হিসেবে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় কর্মরত। প্রানচঞ্চল এই পুলিশ সদস্য তার কর্মস্থলে আসা যাওয়া করেন বাইসাইকেলে চড়ে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হওয়ার সুবাদে বেশ আলোচিত লুৎফার বাইসাইকেল চালানোর ঘটনাটি। সিলেটের বালাগঞ্জের একেবারে প্রত্যন্ত জিনারচর গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম লুৎফা বেগমের।

    উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেই ২০০৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন লুৎফা। যদিও তার বান্ধবী ও সহপাঠীরা অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিল এখানে আসতে। রংপুর পিটিসিতে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেই পেশাগত জীবনের শুরু। ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন। কর্মস্থলে যাওয়া আসার সুবিধার্থে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আট হাজার টাকা দিয়ে ২০১৫ সালে বাইসাইকেল কিনে ফেললেন বংশাল থেকে।

    যাওয়া আসার পথে অনেকেরই অবাক দৃষ্টি খেয়াল করে তার সাইকেল চালানো। এর মাঝে অনেকের ইতিবাচক বিস্ময় ও প্রশংসা তাকে অনুপ্রাণিত করে। কেউ কেউ যে বিরুপ মন্তব্য করে না তা নয়। কিন্তু তাতে দমে যাবার পাত্র লুৎফা নন। আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, চলতে গেলে হোঁচট খেতেই পারি। তাই বলে কি থেমে থাকব? কখনোই না।

    চাকরির পাশাপাশি রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করছেন । কলেজের বান্ধবীরা যেসব কারণে তাকে নিরুৎসাহিত করেছিল এখানে আসার পর সেগুলোর কোন মিলই পাচ্ছেন না। বেশ ইতিবাচক ধারণা নিয়েই অন্য নারীদেরও তিনি উৎসাহিত করেন পুলিশ বাহিনীতে আসার জন্য।

    পান্না আক্তার

    ‘সার্জেন্টের কাজ মানেই তো রাস্তায় থাকা, রোদ বৃষ্টি ধুলার মধ্যে থাকতে হবে সারাদিন। মেয়েদের এ চাকরীতে যেতে হবে কেন!’- আত্নীয়স্বজনদের এ কথাগুলোতে অসম্মান আর তিরষ্কার স্পষ্ট। কিন্তু গায়ে মাখেননি নেত্রকোনার খিলা গ্রামে জন্ম নেয়া পান্না আক্তার। বরং বন্ধুর পথ পেরিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার অদম্য আগ্রহ বুকে নিয়ে অংশ নেন প্রথমবারের মত নারী সার্জেন্ট নিয়োগ পরীক্ষায়। পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে পান্না ৬ মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করেন ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। যোগদান করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে। শুরু হয় কর্মক্ষেত্রের আসল চ্যালেঞ্জ। মুখোমুখি হন নানা অভিজ্ঞতার।

    ২০০৯ সালে বাবাকে হারান পান্না। বাবা হারানো মেয়েকে ঘিরে মায়ের ভালবাসা, শংকা, আবেগ একটু বেশি থাকবে এটিই স্বাভাবিক। সেকারণেই হয়তো পান্নার মাও চাইতেন না তার মেয়ে সার্জেন্ট হিসেবে চাকরি করুক। কিন্তু নিম্মবিত্ত পরিবার থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন পান্না দেখেছিলেন তা বাস্তবায়ন করার সুযোগ চিনতে ভুল করেননি। তাই ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে পান্না যোগ দেন সার্জেন্ট হিসেবে।

    ফেরা যাক কর্মস্থলে তার অভিজ্ঞতার কথায়। প্রথম প্রথম পথচারী বা ড্রাইভাররা অবাক চোখে তাকাত। ঢাকার রাজপথে স্মার্টলী দায়িত্ব পালন করছেন নারী সার্জেন্টরা। কিছু কিছু নেতিবাচক আচরণের মুখোমুখি হতে হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু তা ধৈর্যের সাথেই মোকাবেলা করেন পান্না। অধিকাংশ সময়ে প্রশংসা আর অনুপ্রেরণার কথাই শুনেছেন। তেজগাঁও লাভ রোডে দায়িত্ব পালন করছিলেন একদিন। হঠাৎ একটি গাড়ি থামল, বেরিয়ে এসে এক বৃদ্ধা কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। ঐ বৃদ্ধা দুচোখে তৃপ্তি নিয়ে পান্নাকে বলল ‘মা আমাদের সময়ে আমরা পারিনি, তোমরা পেরেছ।’

    কলেজে পড়া অবস্থায়ই গাড়ি চালানো শিখেছিলেন দুরন্ত এই মেয়েটি। এটিই একদিন তার জীবনের বিরাট আনন্দের উপলক্ষ নিয়ে আসল। পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭ তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্যারেড পরিদর্শনের গাড়ি চালিয়েছেন পান্না। ঐ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তার কাঁধে হাত রেখে তাকে বলেছিলেন, “Thank you, Thank you”. শব্দ চারটি আজও তার কানে বেজে মনে স্বর্গীয় এক দ্যোতনা জাগায়! এর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণার আর কি হতে পারে।

    আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী হয়ে যেমন সবক্ষেত্রেই সফল, তিনিও চান সব পেশায়ই মেয়েরা আসুক বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীতে। তবেই এগিয়ে যাবে সমাজ।

    মাধবী রানী পাল

    যখনই ডাক এসেছে ফোর্স নিয়ে বেরিয়ে গেছেন ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে। মিছিল মিটিং হরতাল সহ নানা সময়ে সাহসিকতার সাথে ডিউটি করে গেছেন সঠিকভাবে। তিনি নারী সাব-ইন্সপেক্টর মাধবী রানী পাল। কর্মক্ষেত্রে পুরুষ অফিসারদের মতই সমান তালে করেছেন মোবাইল পেট্রোল, পিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের ডিউটি। কখনোই মনে হয়নি তিনি তার পুরুষ সহকর্মী কারো কাছ থেকে সক্ষমতায় বা যোগ্যতায় পিছিয়ে আছেন। ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন কাজের মাধ্যমে। সমাজের অন্য নারীদের সামনে নিজেকে পরিণত করছেন নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্তে ।

    সম্প্রতি শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন সাব-ইন্সপেক্টর মাধবী। নিজ যোগ্যতায় বিশ্ব পরিমন্ডলে কাজ করার সুযোগ পাওয়া এই কর্মকর্তা স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেছেন বরিশাল বিএম কলেজ থেকে। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার খলিসাখালী হলেও পিতার চাকরি সূত্রে তার বেড়ে ওঠা বরিশাল শহরেই।

    রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমী থেকে মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করে ২০১০ সালে যোগদান করেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতয়ালী থানায়। শিক্ষানবীশ কাল শেষ হওয়ায় পরপরই তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন মামলা তদন্ত করছেন সফলতার সাথে, কুড়িয়েছেন প্রভূত সুনাম। এজন্য তিনি তার সহকর্মী ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঐকান্তিক সহযোগিতাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।

    পুলিশ বাবার অনুপ্রেরণায় এ চাকরিতে আসা মাধবী জানালেন বিয়ের পর থেকেই তার দন্ত চিকিৎসক স্বামী ও পরিবারের অন্যান্যদের আন্তরিক সমর্থনের কথা। ৩ বছরের মেয়ে রয়েছে তার, তবে পরিবারকে সময় কম দিতে পারার জন্য রয়েছে কিছুটা আফসোস। তবুও চিত্ত তার হৃষ্ট, কেননা তিনি ভাবেন কাজ তো করছি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য।

    মাধবী মনে করেন মেয়েদের বেশি বেশি করে পুলিশে আসা উচিত কারণ এখানে দেশের নিরাপত্তার পাশাপাশি, নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যায়। রয়েছে সম্মান আর বৈচিত্র্যপূর্ণ্য কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করার এক বিরাট সুযোগ।

    বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। নারী ও শিশুদের জন্য অধিকতর সহানুভূতিশীল পুলিশিং নিয়ে কাজ করা এ সেন্টারের কাজের অভিজ্ঞতাও বেশ ভিন্ন ধরনের। বড় পরিসরে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে এখানে। তাছাড়া জাতিসংঘ মিশন থেকে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করবেন, দেশে ফিরে তা কাজে লাগাতে চান দেশ ও জনগণের কল্যাণে।

    আর তাতে হয়তো পুলিশের মত চ্যালেঞ্জিং পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠবে আরো অনেক নারী। নারীদের স্বনির্ভরতা অর্জনে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ পুলিশ।

    -এলএস

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে daynightbd.com