• শিরোনাম

    গভীর সমুদ্রে দুই দিন

    রিমানা জাহিদ জেরিন, বঙ্গোপসাগর থেকে ফিরে | ০৭ জানুয়ারি ২০১৮

    গভীর সমুদ্রে দুই দিন

    তখন মধ্যরাত। আর কিছু সময় পরই শুরু হবে সমুদ্রযাত্রা। সবাই মিলে রওনা হবেন গভীর সমুদ্রে। কক্সবাজারে ইনানী সমুদ্র সৈকতের অদূরে রিজু খাল হয়ে স্পিডবোটে যেতে হবে পোতাশ্রয়ে নোঙর করে রাখা যুদ্ধজাহাজে। স্পিডবোটে অন্তত ২৫ মিনিটের দূরত্ব। বোটে ওঠার আগেই কেন যেন মাথা চক্কর খেলো! এর পরই শুরু হলো দফায় দফায় বমি।

    সহযাত্রীদের কেউ কেউ বলতে লাগলেন, সমুদ্রে গেলে ‘সি সিকনেস’-এর প্রভাবে আরও খারাপ অবস্থা হতে পারে। কেউ আবার অভয় দিচ্ছিলেন। তবে সমুদ্র যাওয়ার জন্য মনটা বড়ই টানছিল। শেষ পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতার বাধা মনের জোরে ডিঙিয়ে রাতের আঁধারে রওনা হলাম রিজু খালের দিকে। ইনানীর মূল সড়ক থেকে মেঠো পথে ১০ মিনিট হেঁটে রিজু খালে পৌঁছলাম আমরা। সেখানে সারি সারি স্পিডবোট বাঁধা ছিল।

    সংবাদকর্মীসহ অন্য সহযাত্রীদের কে কোন বোটে উঠবেন ভাগ করে দেওয়া হলো। এমনকি পোতাশ্রয়ে থাকা কোন জাহাজে কারা উঠবেন তাও ঠিকঠাক ছিল অনেক আগেই। সমুদ্রের জলরাশিতে দুলুনি খেতে খেতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে স্পিডবোট থামল ফ্রিগেট বিজয়ের গা ঘেঁষে। এরপর বোট থেকে জাহাজে ওঠার পালা। সতর্কতার সঙ্গে একে একে আমরা উঠলাম যুদ্ধজাহাজে।

    সেখানে রাতেই সংক্ষিপ্ত সময়ে জাহাজের কমান্ডিং অফিসার (সিও) কমান্ডার ফজলার হকের সঙ্গে পরিচয় পর্ব সেরে নেওয়া হলো। আমার শারীরিক অসুস্থতার খবর ততক্ষণে জেনে গিয়েছিলেন সিও। দ্রুত আমাকে নেওয়া হলো জাহাজের একটি কক্ষে। সেখানে চিকিৎসার সব সরঞ্জাম ও ওষুধের ব্যবস্থা রয়েছে। মনে হলো, জাহাজের ভেতরে ছোটখাটো একটি হাসপাতাল। প্রেশার মাপাসহ টুকটাক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল বিশেষ কোনো সমস্যা নেই।

    প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে আয়োজন করে দু’দিনব্যাপী (২৮-২৯ নভেম্বর ২০১৭) মাল্টিল্যাটারাল ম্যারিটাইম সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ এক্সারসাইজ (ইমসারেক্স)। এবারের মহড়ায় ইন্ডিয়ান ওশান নেভাল সিম্পোজিয়ামের (আইওএনএস) ২৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৫টি দেশ ও ৯টি পর্যবেক্ষক দেশের মধ্যে ৭টি অংশগ্রহণ করেছে।

    সমুদ্রে সম্প্রীতির এ মহাসম্মিলনে ৪১টি যুদ্ধজাহাজ অংশ নেয়। তার মধ্যে আট বিদেশি জাহাজ। বাকি জাহাজগুলো বাংলাদেশের। আন্তর্জাতিক সমুদ্র মহড়া দেখাতে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আমাদের নেওয়া হয় যুদ্ধজাহাজে। জাহাজে প্রথম রাতে ওঠার পরপরই নির্ধারিত শোবার ঘর আমাদের দেখিয়ে দেওয়া হয়। একেকটি কক্ষে ১০-২০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ওপরে-নিচে ২-৩টি করে সিট। একেক সিটে একেকজনকে ঘুমাতে হয়।

    শোবার ঘরের পাশেই বাথরুম। প্রথম রাতেই ঘুরে ঘুরে জাহাজের একটি বড় অংশ দেখার পালা শেষ। যতই দেখছি ততই নানা ব্যাপারে বিস্ময় আর কৌতূহল বাড়ছে। খাবার ঘরে গিয়ে দেখি এলাহিকান্ড! সেখানে সুন্দর করে সাজানো-গোছানো সোফার ব্যবস্থা। রয়েছে টেলিভিশন। ২৮ নভেম্বর সকালে পোতাশ্রয় থেকে নোঙর তুলে একযোগে ৪১টি যুদ্ধজাহাজ গভীর সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করল। সত্যি, চোখের সামনে এতগুলো যুদ্ধজাহাজের সমুদ্র অভিযানের দৃশ্য ছিল অনিন্দ্যসুন্দর! সব জাহাজ তিন ভাগে ভাগ হয়ে মহড়ায় অংশ নেয়।

    মহড়ায় অংশ নেওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে ৩৩টি বাংলাদেশের, চারটি ভারতের, একটি চীনের, একটি ইন্দোনেশিয়ার ও ২টি ইরানের। নীল সমুদ্রে জাহাজে উড়ছে নিজ নিজ দেশের পতাকা। ২৮ নভেম্বর দুপুরের পরপরই মহড়ার মূল পর্ব শুরু হয়। তার আগেই আমাদের সবার কোমরে বেঁধে দেওয়া হয় লাইফড্রাফট। কোনো কারণে জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়লে লাইফড্রাফট জীবন বাঁচাতে সহায়তা করে। একেকটি লাইফড্রাফটে অন্তত ২৫ জন বাঁচতে পারেন।

    মহড়ার প্রথম অংশে- হঠাৎ সমুদ্রে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে আগুনের লেলিহান শিখা বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। আগুন লাগার সেই খবর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাঠানো হয় আইওএনএসের সদর দপ্তরে। সেখান থেকে বার্তা পেয়ে আশপাশে থাকা অন্য যুদ্ধজাহাজ দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজকে রক্ষা করতে এগিয়ে যায়। দুর্ঘটনাকবলিত বাণিজ্যিক জাহাজের অদূরেই ছিল ফ্রিগেট বিজয় ও ধলেশ্বরী। দুই ফ্রিগেটের জলধারায় প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

    দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের পাশে ছিল ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ ‘রণবীর’। তারা আগুন নেভাতে এগিয়ে যায়। জাহাজে আগুন লাগলে কীভাবে নেভাতে হবে- সেটার চমৎকার উপস্থাপনা ছিল ওই মহড়ায়। মহড়ার আরেকটি অংশে ছিল একটি এয়ারক্রাফট বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্য। এরপর তার অংশবিশেষ সাগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভাসতে দেখা যায়। অন্য একটি জাহাজ এয়ারক্রাফটের ভাঙা অংশ ভেসে থাকতে দেখে। পরে যুদ্ধজাহাজ থেকে সাগরে বোট নামিয়ে এয়ারক্রাফটের ভাঙা অংশ উদ্ধার করা হয়।

    ২৯ নভেম্বর যখন মহড়া শেষ হয় তখন সমুদ্রে বাঁশি বাজিয়ে আর পতাকা নাড়িয়ে বিদায় জানানো হয় বিদেশি জাহাজকে। এরপর ফ্রিগেট বিজয়ে থাকা নানা ধরনের সরঞ্জাম একে একে দেখালেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা জানালেন, ফ্রিগেট বিজয়ের দৈর্ঘ্য ৮১ মিটার। ঘণ্টায় এর সর্বোচ্চ গতিসীমা ১৯.৫ নটিক্যাল মাইল। জাহাজটির গড় গতিসীমা ১৮ নটিক্যাল মাইল। ফ্রিগেট বিজয়ে হেলিকপ্টার ল্যান্ডিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

    জাহাজে রয়েছে সারফেস-টু-সারফেস গান, মিসাইল, অ্যান্টি এয়ারগানসহ অনেক যুদ্ধ সরঞ্জাম। মহড়ায় অংশ নেওয়ার সময় জাহাজটিতে অন্তত ১৬০ জন সদস্য ছিলেন। যুক্তরাজ্য থেকে কেনা ফ্রিগেট বিজয় ২০১১ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়। জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানালেন,বাংলাদেশের মালিকানাধীন হওয়ার আগে ওই ফ্রিগেটটি ফকল্যান্ডস যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের হয়ে অংশ নেয়। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাজ্য-আর্জেন্টিনার ১৯৮২ সালে ওই যুদ্ধ হয়।

    সেই যুদ্ধে জয়লাভ করে যুক্তরাজ্য। দুই দিনের সমুদ্র মহড়া প্রত্যক্ষ করে ৩০ নভেম্বর সকালে ফ্রিগেট বিজয় এসে থামল চট্টগ্রামের নেভাল জেটিতে। জেটিতে আসার আগেই সেখানে আরেকটি জাহাজে দেখা গেল হলুদ আর কালো রঙের পতাকা। এমন পতাকার অর্থ হলো- ওই জাহাজের পাশেই ভিড়বে আরেক জাহাজ। জেটিতে ফ্রিগেট বিজয় নোঙর করার পর জাহাজে বসানো হলো গার্ডরুম। যাকে সাধারণত বলা হয় ‘গ্যাংওয়ে’। যে কোনো জাহাজে ওঠানামার সব নথি গ্যাংওয়েতে রাখা হয়। গ্যাংওয়ে পেরিয়ে আমরা দু’দিনের সমুদ্র অভিযানের সুখকর স্মৃতি নিয়ে নেমে পড়লাম ডাঙায়। তখনও নীল জলের হাতছানি পিছু তাড়া করছিল।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে daynightbd.com