শীতের সময়েও কমছে না ডেঙ্গুর দাপট। বরং দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। একইসঙ্গে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) ডেঙ্গুতে নতুন করে আরও ৫৭০ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগের ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬২৯ জন। এই নিয়ে ডিসেম্বর মাসের পাঁচদিনে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হলো ২৬ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৪১৫ জন এছাড়া সব মিলিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ৫১৪ জনের এবং মোট আক্রান্ত হলো ৯৪ হাজার ৮৮৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মুত্যুর ৩৫৫ জনই মারা গেছেন ঢাকার বিভাগে। সেই হিসেবে মোট মৃত্যুর ৬৯ দশমিক শুন্য ৬ শতাংশই ঢাকার বিভাগের। আর বাকী ছয় বিভাগে মৃত্যু রয়েছে ৩০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। মৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১৬ জনের মৃত্যু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। মোট মৃত্যুর ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ মহিলা এবং পুরুষ রয়েছেন ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া মোট আক্রান্তের ঢাকা বিভাগে রয়েছেন ৫৪ হাজার ১৪২ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের ৫৭ দশমিক শুন্য ৫ শতাংশ।

তাছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার দুই সিটির ৫৬টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। যা ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট মানদণ্ডের চেয়ে বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৫৫ জন, যাদের মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩৩৯ জন, যাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। মার্চ মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩১১ জন; যাদের মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এপ্রিল মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০৪ জন, যাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। মে মাসে ৬৪৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। জুন মাসে ৭৯৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের, জুলাই মাসে ২৬৬৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় ১৪ জনের, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ৩০ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬ হাজার ৫’শ ২১ জন, সেপ্টেম্বর মাসে মোট আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৮ হাজার ৯৭ জন এবং মোট মৃত্যু হয়েছিল ৮৭ জনের, অক্টোবরে মোট আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩০ হাজার ৮৭৯ জন এবং মোট মৃত্যু হয়েছিল ১৩৫ জনের , নভেম্বর মাসে মোট মৃত্যু হয়েছিল ১৭৩ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন ২৯ হাজার ৬৫২ জন। আর ডিসেম্বরে মাসের পাঁচ দিনে মৃত্যু হয়েছে ২৬ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৪১৫ জন।

চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ডিসেম্বরের ৫ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুবরণ করেছেন ৫১৪ জন। এর আগের বছর ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মোট তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড।

আর মৃত্যুদের মধ্যে সিটি করপোরেশন এবং বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের সিটি করপোরেশনের ভেতরে একজন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৯ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৩ জন, রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) সাতজন, রংপুর বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) দুইজন মারা গেছে। একই সময়ে ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৯৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২১৬ জন মারা গেছেন। ঢাকা সিটির করপোরেশনের বাইরে এবং ভেতরে মোট ৩৫৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মারা যাওয়া রোগীর প্রায় ৬৯ দশমিক শুন্য ৬ শতাংশই ঢাকার বিভাগের।

আক্রান্তদের মধ্যে সিটি করপোরেশন এবং বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ২১৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের সিটি করপোরেশনের ভেতরে ৪৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৪ হাজার ৬২০ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৯ হাজার ৩৩৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩ হাজার ১৬৬জন, রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩ হাজার ৫৬৭ জন, রংপুর বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১ জন ৪৭২ জন। সিলেট বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩১৩ জন। একই সময়ে ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৭ হাজার ৪৬৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০ হাজার ৩৭ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৬ হাজার ৬৪০ জন এবং গাজীপুর জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩ জন। আর্থাৎ মোট আক্রান্তের ঢাকা বিভাগেরই হয়েছেন ৫৪ হাজার ১৪২ জন। সেই হিসেবে মোট আক্রান্তের ঢাকা বিভাগে ৫৭ দশমিক শুন্য ৫ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের থেকে পাঠানো ডেঙ্গু বিষয়ক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলায় হয়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন দুই হাজার ৩৬৯ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ভর্তি ৯৫৮ জন এবং ঢাকার বাইরে রয়েছেন ১ হাজার ৬৩০ জন।

অধিদফতরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬২৭ জন। এছাড়া এ বছরে ডেঙ্গুতে মোট ৯২ হাজার একজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।