মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের আরেক চাচার নাম ছিল আবু তালেব। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা আব্দুল্লাহ ও দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ইন্তেকালের পর আবু তালেব যখন আমাদের নবীর অভিভাবক হলেন। তিনি নবীজিকে দেখবাল করতে থাকলেন। নবীজিকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন।

কুরাইশ বংশের মূর্তি পূজারি সর্দাররা আবু তালেবের কাছে নালিশ জানাল- তোমার ভাতিজা মুহাম্মাদ আমাদের বাপ-দাদার ধর্মের বিরোধিতা করে, আমাদের মাবুদগুলোকে মন্দ বলে। তোমার মত সর্দারের ভাতিজা হওয়ার কারণে এতদিন আমরা বরদাশত করেছি। হয় তুমি তাকে বুঝিয়ে এ কাজ থেকে বিরত রাখো, নতুবা আমাদের কাছে সোপর্দ করে দাও।

আবু তালেব নবীজীকে বললেন, ভাতিজা! সর্দাররা আমার কাছে তোমার নামে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তুমি আমাদের দেবতাদেরকে আর মন্দ বলো না, ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তাদের কাছে আর যেও না। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচা আবু তালেবের কথার জবাব না দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চক্ষু মুবারক দিয়ে দরদর করে পানি পড়তে লাগল।

তখন আবু তালেব বললেন, ভাতিজা! আমার কথার জবাব না দিয়ে কাঁদছ কেন? তোমার চোখের পানি বরদাশত করতে পারি না। বরং তোমার জন্য তো আমি জান দিয়ে দিতে পারি।

মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চাচাজান! মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্যই আল্লাহ পাক আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনি আমার সহযোগিতায় থাকুন আর না থাকুন, যে কাজের জন্য আল্লাহ পাক আমাকে পাঠিয়েছেন সে কাজ তো আমাকে করতেই হবে। তখন আবু তালেব বললেন, যাও, তুমি তোমার কাজ করতে থাক। যে সব সর্দার তোমাকে শায়েস্তা করার হুমকি দিচ্ছে, কথা দিলাম, আমার শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকা অবস্থায় এদের কাউকে তোমার শরীরে আঘাত করতে দেব না।

তোমাকে আঘাত করতে হলে আমাকে হত্যা করতে হবে। এ ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে গেল, আবু তালেব মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। সেই আবু তালেবের জীবনে যখন নবীর সিরাত তথা আদর্শ গ্রহণ করার প্রশ্ন আসল তখন সে বেঁকে বসল।

আবু তালেবের মৃত্যুশয্যায় মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচার শিয়রে বসে বললেন, চাচাজান! শুধু একটিবার মুখে স্বীকার করুন যে, আপনি আমার জীবনাচার গ্রহণ করেছেন, আমার দীন গ্রহণ করেছেন। কাল হাশরের মাঠে আমি আল্লাহকে বলব, হে আল্লাহ! আমি আমার চাচা আবু তালেবকে সঙ্গে নিয়ে জান্নাতে যেতে চাই।

উত্তরে আবু তালেব বললেন, اخترت النار على العار অর্থ : ভাতিজা মুহাম্মাদ! তোমার দীন- তোমার জীবনাচার গ্রহণ না করলে পরকালে জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না এ কথা আমি ভালোভাবেই জানি, কিন্তু মরণকালে যদি আমি তোমার দীন গ্রহণ করি, তাহলে কুরাইশ বংশের লোকেরা আমার সর্দারীর নামে ধিক্কার দেবে যে, আবু তালেবের মত সর্দার মরণকালে বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে ভাতিজার ধর্ম গ্রহণ করেছে। এ ধিক্কারের পরিবর্তে দুনিয়াতে আমার সুনাম বজায় থাকুক। বিনিময়ে জাহান্নামের আগুনকেই আমি গ্রহণ করে নিলাম। (তাফসীরে জালালাইন ২/৩৩২)

নবী আলাইহিস সালাম অত্যন্ত দুঃখিত ও মর্মাহত হলেন। নবী আলাইহিস সালাম মর্মাহত হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করলেন,

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يشاء অর্থ : হে মুহাম্মাদ! আবু তালেব আপনার মুহাব্বতের চাচা। কিন্তু সে আপনার সীরাতের আদর্শ গ্রহণ করতে রাজি নয়, আপনার তরিকা ও দীন গ্রহণ করতে রাজি নয়। সুতরাং এ আবু তালেবকে আপনি ঈমানদার বানাতে পারবেন না, আপনি তাকে জান্নাতেও নিয়ে যেতে পারবেন না। (সুরা কাসাস-৫৬)

হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পরকালে জাহান্নামে আমার চাচা আবু তালেবের পায়ে আগুনের তৈরি দু’টি জুতা পরিয়ে দেয়া হবে। জুতার আগুনের উত্তাপে তার মাথার মগজ পর্যন্ত বুদ্বুদের মত টগবগ করে উথলাতে থাকবে এবং এ আজবে সে চিরকাল থাকবে। সুতরাং নবীর জীবনাদর্শ গ্রহণ না করে নবীজীর মুহব্বতে জান দিতে রাজি থাকলেও যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যেত তাহলে সবার আগে আবু তালেব নাজাত পেয়ে যেত। কিন্তু আবু তালেবও চিরস্থায়ী জাহান্নামি।

এখানে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে, হাদিসে আল্লাহর রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده والناس أجمعين অর্থ : তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত রাসুলকে নিজের পিতা, নিজের পুত্র এবং সমগ্র জগৎবাসীর চেয়ে বেশি মুহাব্বত না করবে। (সহিহ বুখারি; হা.নং ১৫)

আবু তালেব তো নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুহাব্বত করেছিল, তারপরও ঈমানদার হতে পারল না কেন? কারণ মুহাব্বত দুই প্রকার।

১. নবীর দীন, তরিকা ও আদর্শ নিজের জীবনে নিজে গ্রহণ করার মাধ্যমে নবীকে মুহাব্বত করা। ২. নবীর দীন ও তরিকা বাদ দিয়ে নবীকে মুহাব্বত করা। আবু তালেবের মধ্যে নবীর মুহাব্বত ছিল, কিন্তু সে নবীর দীন ও আদর্শ গ্রহণ করতে রাজি ছিল না।

অতএব কেউ যদি এমন হয় যে, সিরাতুন্নবীর আদর্শ গ্রহণ করতে রাজি নয়, অথচ নবীর মুহব্বতে জান দিতে প্রস্তুত- তাদের এ মুহাব্বতের বিনিময়ে পরকালে আবু তালেবের মত ফলাফল ছাড়া কিছুই মিলবে না।

রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى قالوا يا رسول الله ومن يأبى قال من أطاعني دخل الجنة ومن عصاني فقد أبى অর্থ : আমার সব উম্মত জান্নাতে যাবে, কিন্তু যারা অস্বীকার করে তারা জান্নাতে যেতে পারবে না। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে নবী! অস্বীকারকারী কারা? নবী আলাইহিস সালাম বললেন, যারা আমার সিরাত ও আদর্শের অনুকরণ করে, তারা আমাকে মান্য করে, তারাই আমার সঙ্গে জান্নাতে যাবে। আর যারা আমার আদর্শ গ্রহণ করে না, তারা আমাকে অস্বীকার করে, সুতরাং তারা জান্নাতে যাবে না। (সহিহ বুখারী; হা.নং, ২/১০৮১ মিশকাত ২৭)