https://daynightbd.com


পদত্যাগের পর আত্মসমর্পণ করেছেন পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির নির্বাচন কমিশনার লিয়াকত আলী চাতা। শনিবার ভোট জালিয়াতির সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি দেন তিনি। এদিন নিজের বিচার চেয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন চাতা। তার এই স্বীকারোক্তি পাকিস্তানজুড়ে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করেছে। আর এরই জেরে উঠেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবি। চাতার স্বীকারোক্তির পর কারচুপির ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
এদিকে নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগের (পিএমএলএন) নেত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব ইমরান খানকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে তোপে পড়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘২০১৪ সালে যখন চীনের প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন, ওই সময় ইমরানের শিরচ্ছেদ করা উচিত ছিল।’ খবর ডন, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও জিও নিউজের
পাকিস্তানে ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক চলার মধ্যে শনিবার বিস্ফোরক মন্তব্য করেন চাতা। তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন ও প্রধান বিচারপতি কাজী ফায়েজ ইসা ভোট কারচুপিতে জড়িত। অবশ্য নির্বাচন কমিশন ও প্রধান বিচারপতি ফায়েজ ইসা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, পুলিশ চাতার কার্যালয়টি সিলগালা করে দিয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো মামলা না হওয়ায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি। তবে নিরাপত্তা হেফাজতের কথা জানিয়ে তাকে অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এদিকে জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেছেন, নির্বাচনের দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মী ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট উপকরণ ও নথিগুলো নিরাপদে রাখা হয়েছে।
ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারচুপিতে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে মিডিয়ার সামনে রাওয়ালপিন্ডির কমিশনারের স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি পাকিস্তানজুড়ে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করেছে। পরে প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এবং তার সহযোগীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি করে। একই সঙ্গে কারচুপির অভিযোগের ব্যাপারে বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবি করা হয়।
পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) রাওয়ালপিন্ডির এই কমিশনারের মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পিএমএল-এন নেতা রানা সানাউল্লাহ বলেছেন, রাওয়ালপিন্ডির কমিশনারকে একজন মানসিক বিকৃত বলে মনে হয়েছে এবং সে কারণেই তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন। পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজও (পিএমএল-এন) নির্বাচনি জালিয়াতির এই অভিযোগের তদন্ত দাবি করেছে। দলটির তথ্য সচিব মরিয়ম আওরঙ্গজেব কমিশনার চাতার ব্যবহৃত সব যোগাযোগ চ্যানেলের গভীর তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন এবং তার নাম বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ তালিকায় (ইসিএল) রাখার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ইমরান খানের দল পিটিআই দাবি করেছে, সাধারণ নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি নিয়ে রাওয়ালপিন্ডির কমিশনার লিয়াকত আলী চাতা যে কথা ফাঁস করেছেন তাতে সিইসি সিকান্দার সুলতান রাজা এবং প্রধান বিচারপতি কাজী ফয়েজ ঈসার পদত্যাগ করা উচিত। দলের মুখপাত্র বলেন, নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে লিয়াকত আলী চাতার এই বক্তব্য পিটিআইয়ের অবস্থানকেই সমর্থন করছে যে, কীভাবে রাতের অন্ধকারে জনসাধারণের ম্যান্ডেট চুরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার এই বক্তব্য নির্বাচনি কারচুপির সঙ্গে জড়িত অন্যদের আসল চরিত্রও প্রকাশ করে দিয়েছে।
পিটিআই মুখপাত্র আরও বলেন, রাওয়ালপিন্ডির কমিশনার স্বীকার করেছেন-৭০ হাজার ভোটেরও বেশি ভোটে এগিয়ে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়কে জালিয়াতি করে পরাজয়ে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই সাক্ষ্য পিটিআইয়ের অবস্থানকে সমর্থন করে। তার কথাতেই বোঝা যায়, লোকেরা পিটিআই-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছে। রাতের আঁধারে ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে জয়ী পিটিআই প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইমরানের শিরচ্ছেদ করা উচিত ছিল, বললেন পিএমএলএন নেত্রী : ২০১৪ সালে পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিল পিএমএলএন। সে সময় তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ইমরান খান। মরিয়ম আওরঙ্গজেব বলেছেন, ইমরান ও তার দলীয় নেতাদের যদি ওই সময়ই শিরচ্ছেদ করা হতো; তাহলে এখন তিনি আর ‘সমস্যার’ কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না।
গত ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ অস্থিতিশীল রয়েছে। এর মধ্যেই মরিয়ম আওরঙ্গজেবের এমন মন্তব্য অবাক করেছে দেশটির বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে। এই সহিংস বক্তব্যকে ঘিরে ক্ষোভও সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনে। পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল ইউসুফ এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, রাজনীতিতে সহিংসতার কোনো স্থান নেই এবং সবাইকে তাদের মত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে।
মেহের তাতার নামের এক সাংবাদিক বলেন, ‘মরিয়ম আওরঙ্গজেব পিএমএলএনের সহিংস মনোভাবের একজন প্রতিনিধিত্বকারী। দলটির নেত্রী মরিয়ম নওয়াজ ইমরানকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলেছেন এবং তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে একাধিকবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।’
মরিয়ম আওরঙ্গজেবের এমন মন্তব্য নজরে এসেছে বিদেশিদেরও। রায়ান গ্রিম নামের এক মার্কিন সাংবাদিক বলেছেন, ‘পিএমএলএনের তথ্য সচিব দলের দুর্বল নির্বাচনি পারফরমেন্স নিরীক্ষা করছেন।’


