https://daynightbd.com


মস্কোর উপশহরে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৩ জন হয়েছে; জানিয়েছে ক্রেমলিন। ক্রাসনোগর্স্কের সিটি হলে কনসার্টের আগমুহূর্তে চালানো ওই হামলায় আহত হয়েছেন শতাধিক। হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১০৭ জন। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন চার বন্দুকধারীসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা আগেই হামলার ব্যাপারে রাশিয়াকে সতর্ক করেছিল। তবে ক্রেমলিন এতে কান দেয়নি।
ইসলামিক স্টেটের আফগানিস্তান শাখা ইসলামিক স্টেট খোরসান (আইএসআএস-কে) হামলার দায় স্বীকার করেছে। রাশিয়া হামলার সঙ্গে কিয়েভের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিলেও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, হামলায় ইউক্রেনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে হামলার জেরে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন জোরদার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ঘটনার বদলা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ক্রেমলিন।
রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাস রুশ তদন্ত কমিটির বরাতে জানিয়েছে, হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে ৪১ জনের পরিচয় প্রকাশ করেছে রাশিয়া।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, রাশিয়ার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির প্রধান আলেকসান্দার বর্তনিকোভ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানিয়েছেন, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে ‘চার সন্ত্রাসী’ আছে আর এফএসবি তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
রুশ তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় সামরিক বাহিনীর মতো পোশাক পরা অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে সঙ্গীতানুষ্ঠানে আগত লোকজনের দিকে নির্বিচার গুলি ছোড়ে। রুশ আইনপ্রণেতা আলেকসান্দার কাইনেস্তিন জানিয়েয়েছেন, হামলাকারীরা একটি রেনো গাড়িতে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। রাতে মস্কো থেকে ৩৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ব্রাইয়ানস্ক অঞ্চলে গাড়িটিকে দেখতে পায় পুলিশ। তাদের থামার সংকেত দিলে তা না মেনে এগিয়ে যায় তারা। গাড়ি নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করে দুজনকে আটক ও গ্রেফতার করে পুলিশ। দুজন পাশের বনে পালিয়ে যায়। ক্রেমলিনের ভাষ্য, পরে তাদেরও আটক করা হয়। কাইনেস্তিন জানান, গাড়িটিতে তাজিকিস্তানের কয়েকটি পাসপোর্ট, পিস্তল ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের একটি ম্যাগাজিন পাওয়া গেছে।
প্রসঙ্গত, মধ্য এশিয়ার মুসলিম প্রধান দেশ তাজিকিস্তান আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল।
আইএসের দায় স্বীকার : একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ইসলামিক স্টেটের আফগানিস্তান শাখা ইসলামিক স্টেট খোরসান (আইএসআএস-কে) হামলার দায় স্বীকার করে বার্তা সংস্থা আমাকের টেলিগ্রাম পেজে জানিয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন গোয়েন্দারা এমনটি নিশ্চিত করেছেন। এক বিবৃতিতে আইএস বলেছে, ‘তাদের যোদ্ধারা মস্কোর শহরতলিতে হামলা চালিয়েছে। কয়েকশ জনকে হত্যা ও আহত করেছে এবং স্থানটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। তারপর তারা নিরাপদে তাদের ঘাঁটিতে ফিরেছে।’
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আইএসের ওই গোষ্ঠীটির দাবি বিশ্বাসযোগ্য। তবে রাশিয়া এই বক্তব্যের বিপরীতে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
আগেই সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, কান দেয়নি মস্কো : বিবিসি বলছে, মস্কোতে কোনো বড় জনসমাগমস্থলে হামলা হতে পারে, তা মার্চের শুরুর দিকেই রাশিয়ার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র আদ্রিয়েন ওয়াটসন বলেন, মস্কোতে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা হচ্ছে, বিশেষ করে কনসার্টসহ কোনো জনসমাগমস্থলে, চলতি মাসের শুরুর দিকেই এমন তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এসেছিল। ওয়াশিংটন সেই তথ্য রুশ কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেই সতর্কবার্তাকে ‘মিথ্যা প্রচার’ বলে উড়িয়ে দেয় ক্রেমলিন।
ওই সময় রাশিয়ায় থাকায় নাগরিকদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ প্রকাশের পরও তাতে কান দেয়নি রাশিয়া।
রাশিয়া দুষলেও সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার কিয়েভের, চিন্তা বাড়ল ইউক্রেনের : কোনোরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এফএসবি) এই হামলার সঙ্গে কিয়েভের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়েছে। এফএসবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইউক্রেন সীমান্তের দিকে যাওয়ার সময় ওই বন্দুকধারীদের আটকাতে সমর্থ হয়েছে তারা। পরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই দাবি করেন। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নাকচ করা হয়েছে।
সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ টেলিগ্রাম অ্যাপে লিখেছেন যে, হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা যদি ইউক্রেনীয় হয়ে থাকে, তাদের সবাইকে খুঁজে বের করতে হবে এবং সন্ত্রাসী হিসেবে তাদের ধ্বংস করে দিতে হবে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা মাইখাইলো পোডোলিয়াক হামলার সঙ্গে ইউক্রেনের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। এক্স-এ একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন-ইউক্রেন কখনো সন্ত্রাসের পথ ব্যবহার করেনি। এই যুদ্ধের সবকিছুই নির্ধারিত হবে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে। তবে তিনি মনে করছেন যে, চলমান সংঘাতের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে এবং ইউক্রেনে সামরিক অভিযান বাড়াতে এই হামলার বিষয়টি ব্যবহার করবে রাশিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার বার্তা : শুক্রবার রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, মস্কোতে কনসার্ট হলে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা যেকোনো তথ্য অবশ্যই শেয়ার করতে হবে। তিনি বলেন, হামলার ঘটনায় ইউক্রেনের জড়িত না থাকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি নিশ্চিত হয়, তবে এ বিষয়ে তাদের কাছে থাকা যেকোনো তথ্য রাশিয়ার সঙ্গে শেয়ার করা উচিত। এর আগে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জন কিরবি শুক্রবার বলেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে ইউক্রেন বা ইউক্রেনীয়রা জড়িত ছিল এমন কোনো আলামত নেই।’ এরপরই রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জাখারোভা প্রশ্ন তোলেন, একটি শোকাবহ ঘটনার মাঝেই মার্কিন কর্মকর্তারা কীসের ভিত্তিতে কারও নির্দোষিতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছান?’ তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা শেয়ার করা উচিত। আর তা না থাকলে তাদের এমনভাবে কথা বলা উচিত নয়।
বদলা নেওয়ার ঘোষণা মেদভেদেভের : মস্কোতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার বদলা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা রাশিয়ান সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপ-প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে এক পোস্টে মেদভেদেভ বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা শুধু সন্ত্রাসের ভাষা বোঝে। যদি বলপ্রয়োগ করা না যায়, যদি সন্ত্রাসীদের হত্যা এবং তাদের পরিবার-স্বজনদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়; তাহলে কোনো তদন্ত বা বিচার কাজে আসবে না। আমাদের সামনে আর কোনো উপায় নেই।’
বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, আলজাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান ও আনাদুলু অবলম্বনে।


