দেশের বিভিন্ন স্থানে বইছে শৈত্যপ্রবাহ। ঘন কুয়াশার কারণে দেখা মিলছে না সূর্যের। জেঁকে বসা শীতে রাস্তাঘাটে চলাচল কমেছে মানুষের। কমেছে শ্রমজীবী মানুষের রোজগার। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। গরম কাপড়ের অভাবে কষ্ট বেড়েছে ছিন্নমূল মানুষের। খড়কুটো পুড়িয়ে ঠান্ডা নিবারণের চেষ্টা করছেন। দুয়েক জায়গায় সরকারি কম্বল বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া শীতের কারণে কোথাও কোথাও খুরা ও গলা ফোলা রোগে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু।
দিনাজপুর : দিনাজপুরে দশ দিন ধরে চলছে শৈত্যপ্রবাহ। গত কয়েক দিন থেকে সূর্যের দেখা মিলছে না। কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষরা।
এদিকে তীব্র শীতে চাহিদা বেড়েছে পুরোনো গরম কাপড়ের। জমে উঠেছে গরম কাপড়ের বেচাকেনা। দিনাজপুর শহরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে হকার্স মার্কেট থেকে শুরু করে বড় শপিংমল এবং ফুটপাথের দোকান-সব জায়গাতেই সব শ্রেণির ক্রেতার ভিড় দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ ক্রেতাই পুরোনো কাপড়ের হকার্স মার্কেটেই বেশি ঝুঁকছেন।
বীরগঞ্জ উপজেলার চাকাই গ্রাম থেকে কাপড় কিনতে আসা আশরাফুল বলেন, শহরে কাজ ছিল। যে ঠান্ডা পড়েছে, যাওয়ার সময় পরিবারের জন্য এই পুরোনো কাপড়ের মার্কেট থেকে পছন্দমতো কিছু গরম কাপড় কিনতে এসেছি। গতবারের চেয়ে দাম বেশি চাইছে।
দিনাজপুর হকার্স মার্কেট সমবায় সমিতির নেতা মো. নেসার আহমেদ বলেন, কয়েক দিন থেকে শীত বেড়ে যাওয়ায় পুরোনো গরম কাপড়ের বেচাকেনা বেড়েছে। দাম কিছু বাড়ার কথা স্বীকার করেন তিনি।
অন্যদিকে দিনাজপুরের নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন তরুণ শিক্ষার্থীরা। পকেট খরচ বাঁচিয়ে জমানো টাকা দিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যস্ত তারা। বৃহস্পতিবার সকালে শহরের বিভিন্ন সড়কে ঘুরে ঘুরে অসচ্ছল ও প্রকৃত শীতার্তদের খুঁজে খুঁজে এসব বিতরণ করে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা সংগঠন ‘বাস্তবায়ন’। বৃহস্পতিবার শীতবস্ত্র বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন ‘বাস্তবায়ন’-এর প্রতিষ্ঠাতা মাশুক রহমান প্রান্ত, রাতুল আল মুবতাসিম, শাহারিয়ার বিপ্লব, রিজ্জাতুল আত্বিন রুদ্র।
বৃহস্পতিবার দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, আজ জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ। তবে ঘন কুয়াশার কারণে ঠান্ডার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
হিলি (দিনাজপুর) : হিমেল হাওয়া, ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে হিলির জনজীবন। দুদিন থেকে দেখা মেলেনি সূর্যের। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন কর্মজীবী ও ছিন্নমূল মানুষরা। শীতবস্ত্রের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অনেকে। কুয়াশার কারণে ট্রেন, বাসসহ অন্যান্য যানবাহন দিনের বেলায়ও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। রোদের অভাবে ধান শুকাতে পারছেন না মিল মালিকরা। কাজের সন্ধানে বের হয়েও কাজ পাচ্ছেন না খেটে খাওয়া মানুষরা। দোকানপাট খুলছে দেরিতে। বেশি কষ্টে আছেন কর্মজীবী ও ছিন্নমূল মানুষরা। শীতবস্ত্রের অভাবে বাড়ির বাইরে বের হতে পারছেন না তারা।
ভ্যানচালক দুলাল বলেন, প্রচণ্ড ঠান্ডা আর খুব বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সকালে বের হয়েছি, এখন দুপুর ২টা বাজে, ১০০ টাকার কাম করছি। ঠান্ডায় মানুষ বের হচ্ছে না। তাই কাজ কমে গেছে। ইনকামও কম হচ্ছে।
অটোবাইক চালক ফিজু বলেন, জীবিকার সন্ধানে অটোবাইক নিয়ে বের হয়েছি। ঘরে বাজার নেই। এ জন্য বাইরে বের হয়েছি। খুব ঠান্ডা পড়েছে। পেটের দায়ে রাস্তায় নেমেছি। তীব্র ঠান্ডার কারণে যাত্রীর সংকট। আগের মতো এখন তেমন ইনকাম নেই।
হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
বেড়া (পাবনা) : কয়েক দিন ধরে হাড় কাঁপানো শীতে বেড়া উপজেলায় জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণির মানুষ কাজকর্মে যেতে না পেরে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এ ছাড়া প্রচণ্ড শীতে গৃহপালিত পশু নিয়ে খামারিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। শীতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে খুরা ও গলা ফোলা রোগে আক্রান্ত হয়ে কৈটোলা, চাকলা ও পৌরসভার বৃশালিখা গ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশত গবাদিপশু মারা গেছে।
বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় গবাদিপশুর খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
চুয়াডাঙ্গা : বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক রকিবুল হাসান বলেন, প্রতিদিনই তাপমাত্রা ওঠানামা করছে জেলায়। বাতাস আর কুয়াশার কারণে শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
শীতের কারণে কর্মহীন থাকায় আয়-রোজগারের অভাবে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন শ্রমজীবী মানুষরা। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কালিদাসপুর গ্রামের ইজিবাইক চালক হাসমত আলী বলেন, রাস্তায় কোনো যাত্রী নেই। সকাল থেকেই বসে আছি। মানুষ শীতের জন্য ঘর থেকে কম বের হচ্ছে। মানুষ না থাকায় ভাড়া তেমন একটা নেই।
চুয়াডাঙ্গা বড়বাজারের মুদি ব্যবসা আবু বক্কর জানান, শীতের কারণে মানুষের উপস্থিতি অনেক কম। বাজারে মানুষ না আসার কারণে বিক্রি নেই বললেই চলে। সকাল থেকে বেশিরভাগ সময় বসে থাকতে হয়।
হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জে হিমেল হাওয়া আর কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত। গত তিন দিনের কোথাও সূর্যের আলো দেখা যায়নি। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পুরো জেলা। দিনের বেলা যানবাহনগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা যায়। অন্যদিকে অন্যান্য বছরের মতো এ বছর শীতবস্ত্র বিতরণের তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। এ কারণে খেটে খাওয়া মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করছেন।
হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা। জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ইউনিটে তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই। চিকিৎসাসেবা দিতে ডাক্তাররা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। হাসপাতালের মেঝে-বারান্দাসহ সব জায়গায় ঠান্ডাজনিত সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া নিয়ে রোগীরা শুয়ে আছেন। সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার মিঠুন রায় বলেন, কনকনে শীতের কারণে নিউমোনিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক এবং শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে আমরা আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
জেলা পরিষদের সামনে কাগজে আগুন ধরিয়ে হাত গরম করতে করতে ষাটোর্ধ্ব রিকশাচালক তপু মিয়া বলেন, ঠান্ডায় হাত-পা বসে গেছে, রিকশা চালাতে পারছি না। মাত্র ২০ টাকা রুজি করেছি, বউ, ছেলে-মেয়ে মিলে আমার পাঁচজনের সংসার। যেভাবে হোক বিকালে চাল-ডাল নিয়ে বাসায় ফিরতে হবে। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি।
কুড়িগ্রাম : প্রচণ্ড শীতে কাবু হয়ে পড়েছে জেলার সাধারণ মানুষজন। দুদিন থেকে সূর্যের দেখা না মেলায় ঠান্ডা বেশি অনুভূত হচ্ছে এ অঞ্চলে। বৃহস্পতিবার সকালে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের তাপমাত্রা কমে রাতের তাপমাত্রার কাছাকাছি হওয়ায় দুপুর পর্যন্ত ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। কনকনে ঠান্ডা আর হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষজন কাজে বের হলেও প্রয়োজনীয় গরম কাপড়ের অভাবে কষ্টে রয়েছে তারা।
কুড়িগ্রামে রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বৃহস্পতিবার সকালে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি বলেন, তাপমাত্রা আরও দুয়েক দিন এমন থাকবে। পরে একটু উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া এই মাসে আরও একটি শৈত্যপ্রবাহ এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুশফিকুল আলম হালিম জানান, সদর উপজেলায় শীত নিবারণে ৪ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এ মুহূর্তে শীতবস্ত্র মজুদ নেই। বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পেলে বিতরণ করা হবে।
পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) : পাটগ্রাম উপজেলাজুড়ে দিনের শুরু থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেখা মিলছে না সূর্যের। কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারপাশ। শীতের এমন প্রকোপে উপজেলাজুড়ে বাড়ছে নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউমোনিয়া, হাঁপানি জ্বর-সর্দি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিতে প্রতিদিনই পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভিড় করছেন শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। হাসপাতালে শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ধারণক্ষমতারও ৫-৬ গুণ বেশি। এর মধ্যে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ জন রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে।
পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. জহির উদ্দীন মো. বাবর বলেন, গতবারের তুলনায় এবার শীতের প্রকোপ বেশি হওয়ায় প্রতিনিয়ত আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঠান্ডাজনিত রোগী আসছে ব্যাপক হারে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
লালমনিরহাট সিভিল সার্জন নির্মলেন্দু রায় জানান, গত কয়েক দিন থেকে জেলায় শীতের প্রকোপ বেড়েছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। আমরা রোগীদের চিকিৎসা দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি।



মন্তব্য করুন