https://daynightbd.com


রোজার অন্যতম অনুষঙ্গ সাহরি ও ইফতার। রোজার সূচনা হয় সাহরির মাধ্যমে। সাহরিতে বরকত রয়েছে রোজা রাখার নিয়তে রাতের শেষ প্রহরে রোজাদাররা যে খাবার গ্রহণ করে, ইসলামি শরিয়াহর পরিভাষায় তাকে সাহরি বলে। সাহরি খাওয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ। এতে বহুবিধ বরকত রয়েছে। আর রোজাকে পূর্ণ করে ইফতার। ইফতার অর্থ ভঙ্গ করা বা সমাপ্ত করা। খুব সামান্য খাবারকে ইফতার বলে। সূর্যাস্তের পর প্রথম যে খাবার বা পানীয় মুখে নেয়ার দ্বারা রোজাকে সমাপ্ত করা হয়— তাই ইফতার। সাহরির মতো ইফতারও রোজার গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পানাহার পরিহারের মাধ্যমে সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা ভোগ করে। ইফতার সে যন্ত্রণা দূর করে রোজাদারের জন্য পরম আনন্দ বয়ে আনে।
সাহরি ও ইফতার এ দুটি বিষয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রয়েছে চমৎকার নির্দেশনা। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা সাহরি খাও। কেননা সাহরিতে বরকত আছে (সহিহ বুখারি : ১৯২৩)।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ। একটি আনন্দ হচ্ছে যখন সে ইফতার করে। আরেকটি হচ্ছে যখন সে প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। তিরমিজি ৭৬৬
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ ১৭৫৩
রাসুল (সা.) আরও বলেন, প্রতিটি ইফতারের সময় এবং প্রতি রাতে লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪৩
রাসুল (সা.) ইফতারের সময় হওয়া মাত্র খুব দ্রুত ইফতার করে ফেলতেন। সাহাবায়ে কেরামকেও দ্রুত ইফতার করার নির্দেশ দিতেন। দ্রুত ইফতার করাই কল্যাণকর। এটা ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কেননা ইহুদি-খ্রিস্টানরা বিলম্বে ইফতার করে। বিলম্বে ইফতার করলে তা ইহুদি খ্রিস্টানদের সাদৃশ্য হয়ে যাবে। তাই রাসুল (সা.) বিলম্বে ইফতার করতে নিষেধ করেছেন।
ইবনে মাজার বর্ণনায় (হাদিস : ১৬৯৮)-এর কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কেননা ইহুদিরা তাদের ইফতার বিলম্বে করে।’ যেকোনো হালাল বস্তু দ্বারা ইফতার করা যায়। তবে খেজুর দ্বারা ইফতার করা সুন্নত। যদি খেজুর না থাকে তাহলে কেবল পানি দ্বারাও ইফতার করা যায়।
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ যখন ইফতার করবে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে, খেজুর না হলে পানি দ্বারা; নিশ্চয় পানি পবিত্র (মুসনাদে আহমদ : ১৬২৩৭)।
হজরত আমর ইবনুল আ’স (রা.) বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমাদের রোজা ও আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিস্টানদের রোজার মধ্যে পার্থক্যকারী হচ্ছে সাহরি খাওয়া। সুনানে নাসায়ি : ২১৬৬)।
সাহরির বরকত ও কল্যাণ নানাবিধ উপায়ে অর্জিত হয়। যেমন এর দ্বারা ইবাদতের শক্তি অর্জিত হয়, দেহ-মনে উদ্যমতা আসে। ক্ষুধার তাড়নায় সৃষ্ট প্রবৃত্তির বাসনা হ্রাস পায়। বিশেষত সাহরির সময়ে তাহাজ্জুদ ইস্তিগফার ও দোয়া-মোনাজাতের সুযোগ লাভ হয়। সাহরি ইসলামের স্বাতন্ত্র্যতার প্রতীক। শেষ সময়ে সাহরি খাওয়া সুন্নত। রাতের শেষ প্রহরে সুবহে সাদিক তথা ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার খানিকটা আগেই সাহরি সেরে নেওয়া উচিত।
হজরত জায়েদ বিন সাবিত (রা.) বলেন, আমরা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাহরি খেলাম। অতঃপর ফজরের সালাতে দাঁড়িয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করা হলো, এই দুইয়ের মাঝে ব্যবধান কতটুকু ছিল। বললেন, পঞ্চাশ বা ষাট আয়াত তিলাওয়াতের সময় পরিমাণ (সহিহ বুখারি : ৫৭৫)।
ইসলাম সর্বদা পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। অপরিমিত বা অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। দেহ-মন ভালো থাকলে ইবাদত করা যেমন সহজ হয়, তেমনি তা আনন্দমুখর হয়। তাই সাহরিতে পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের বিকল্প নেই। যদি সাহরি খেতে মনে না চায় তাহলে এক ঢোক পানি হলেও পান করে নেওয়া উচিত। তবে মনে রাখতে হবে, রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য সাহরি খাওয়া জরুরি নয়। কোনো কারণে সাহরি খেতে না পারলে রোজা রাখতে কোনো সমস্যা নেই।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা রাত শুরু হওয়া পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)।
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, আমার বান্দাদের মধ্যে তারা আমার বেশি প্রিয়, যারা দ্রুত ইফতার করে (সুনানে তিরমিজি : ৭০০)।
হজরত সাহাল বিন সাআদ (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যত দিন লোকেরা ওয়াক্ত হওয়ামাত্র ইফতার করবে, তত দিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে। (সহিহ বুখারি : ১৯৫৭)।
ইফতারের সময়টিতে দোয়া কবুল হয়। তাই এই সময়ে দোয়ার প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তিনটি দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার যখন সে ইফতার করে এবং মজলুমের দোয়া। আল্লাহপাক এটিকে মেঘের উপের তুলে নেন। এর জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেন।
মহান প্রভু বলেন, আমার ইজ্জতের কসম, সময়ের ব্যবধানে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করব (সুনানে তিরমিজি : ২৫২৬)।
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ দুটো সুন্নাহ সাহরি ও ইফতারের বরকত অর্জনে সচেষ্ট হই। এ দুটো সময়ে আল্লাহর কাছে অধিক পরিমাণে দোয়া করি।


