ঢাকার ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন রূপলাল হাউজ এখন সময়ের অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর এই প্রাসাদ একসময় ছিল নগরীর ঐশ্বর্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। অথচ আজ সেটি পরিণত হয়েছে পেয়াজ, রসুন, মরিচ–জিরাসহ নানা মসলার পাইকারি আড়তে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে হিন্দু ব্যবসায়ী ভ্রাতৃদ্বয় রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। রূপলাল দাস (১৮৪৫–১৯১৩) ছিলেন ঢাকার বিশিষ্ট জমিদার ও ব্যাংকার। বুড়িগঙ্গার উত্তর পারে ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত এই বাড়িটি তিনি আর্মেনীয় জমিদার আরাতুনের কাছ থেকে কিনে পুনর্নির্মাণ করেন। ভবনের নকশা করেন মার্টিন অ্যান্ড কোং কোম্পানির একজন স্থপতি।
দ্বিতল এই ভবনের ভিত্তিভূমি ইংরেজি অক্ষর ‘E’-এর মতো, যার তিনটি অংশ শহরের দিকে প্রসারিত। মাঝের অংশটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮.৩৩ মিটার। ছাদ নির্মিত হয়েছে ‘কোরিনথীয়’ শৈলীতে, যার ওপর রয়েছে রেনেসাঁ যুগের ‘পেডিমেন্ট’। দ্বিতীয় তলায় ৫০টিরও বেশি কক্ষ, একাধিক দরবারকক্ষ ও একটি কাঠের মেঝেওয়ালা নাচঘর ছিল এই প্রাসাদের সৌন্দর্যবর্ধক উপাদান।
১৮৮৮ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে এখানে এক বলনৃত্যের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনের চূড়ায় থাকা বিশাল ঘড়িটি ভেঙে পড়ে, যা আর মেরামত করা হয়নি।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় রূপলাল দাসের উত্তরাধিকারীরা দেশ ত্যাগ করলে ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরে নিচতলা দখল করে নেয় মসলা ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে পুরান ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক এই ভবনের নিচতলা জুড়ে গড়ে উঠেছে পেয়াজ–রসুন–মরিচের পাইকারি আড়ত ও গুদাম।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের দেয়ালে জমে আছে ধুলোবালি, খসে পড়ছে প্লাস্টার, ভেঙে যাচ্ছে সিঁড়ি। একসময়কার অলংকৃত খিলান ও দরজাগুলো এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। স্থানীয় বাসিন্দা সালাম উদ্দিন বলেন, “রূপলাল হাউজ এখন ইতিহাস নয়, ব্যবসার জায়গা। কেউ এর দিকে নজর দেয় না।”
দর্শনার্থী জোনায়েদ, যিনি মিরপুর থেকে দেখতে এসেছেন, বলেন, “পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে রূপলাল হাউজ অন্যতম। কিন্তু সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এর গৌরব।”
আড়ত কর্মচারী শাহিন জানান, সরকারি লিজ নিয়ে প্রায় একশ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছেন ব্যবসায়ীরা। ভবনের উপরের তলায় সেনাবাহিনীর কয়েকটি পরিবার বসবাস করেন, তাই সাধারণ মানুষের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ।
পুরাতন ঢাকা সংরক্ষণ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, রূপলাল হাউজ শুধু একটি ভবন নয়, এটি ঢাকার ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। দ্রুত সংস্কার না হলে এটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপলাল হাউজ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও জায়গা দখল, আইনি জটিলতা ও অর্থসংকটের কারণে কার্যকর সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য একসময় বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপলাল হাউজ ছিল ঢাকার ঐশ্বর্য ও ইতিহাসের প্রতীক। আজ সেই প্রাসাদ নিঃশব্দে সময়ের ধুলোয় মিশে যাচ্ছে—ঐতিহ্যের এক নিঃশেষ সাক্ষী হয়ে।


মন্তব্য করুন