নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম (২৩) হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযাগে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

ওসি হান্নানকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জনস্বার্থে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। ডিআইজির কার্যালয়ে যোগদানের জন্য আদেশ জারির দিনই গুরুদাসপুর থানা থেকে ছাড়পত্র দিতে বলা হয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ১৪ অক্টোবর রাতে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম।

এ সময় শাকিলকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান হামলাকারীরা। পরে তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তার বাবা। তবে সোমবার পর্যন্ত ওই মামলায় কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে মঙ্গলবার বিকেলে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের ডিমান্ড চাওয়া হলে আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মিন্টুকে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকেও বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবদল। মিন্টুর সঙ্গে রাসেল নামে এক প্রবাসীর সখ্যতা রয়েছে। শাকিল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্টুর পাশাপাশি রাসেলেরও সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে এমন সন্দেহে জানাজায় অংশ নেওয়া উৎসুক জনতা দোকানপাট ভাঙচুরের পর লুটপাট করেন। এ ঘটনাতেও থানায় কোনো মামলা হয়নি।

পুলিশের বিরুদ্ধে মামলার তদন্তে গাফিলতি করার অভিযোগ করেন নিহত শাকিলের বাবা রবিউল মিস্ত্রি। তিনি বলেন, ১৪ অক্টোবর তার ছেলেকে কুপিয়ে গুরুতর যখম করে দুর্বৃত্তরা। ১৯ অক্টোবর তিনি গুরুদাসপুর থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। সেসময় এমপির নির্দেশেই আমেরিকা প্রবাসী রাসেলের নাম মামলার এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আবার এমপির নির্দেশেই রাসেলের নামটি কেটে দেওয়া হয়। এমপির ছেলে মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা ছাড়া এ ঘটনায় পুলিশ অন্য কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

অপরদিকে গত ২০ এপ্রিল ছাত্রদল নেতা শাকিল নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। ওই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে। যারা আমাকে মারতে পারবে, তাদের নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডায়রি (সাধারণ ডায়েরি) করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে এই ডায়রি (জিডি) অনুযায়ী মামলা করে দেবেন।

জীবদ্দশায় দেওয়া শাকিলের ওই ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, সবকিছু চিন্তা করেই শাকিল হত্যার তদন্ত চলছে।

শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম বলেন, হুমকি পাওয়ার পর তার ছেলে থানায় জিডি করেছিল। এর পর আমার ছেলে হামলার শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ ঘটনার পরও অপরাধী ধরতে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ছিল। এছাড়া এমপি পুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুর সঙ্গে ওসির ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাই তিনি বিষয়টিকে এড়িয়ে চলেছেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। পুলিশ চাইলে অনেক আগেই আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারত। কিন্তু সেটি তারা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান।

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম বলেন, গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নানকে থানা থেকে জনস্বার্থে প্রত্যহার করা হয়েছে। আর ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ। কোনো অবস্থাতেই অন্যায়কারী রেহাই পাবে না। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।