গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন জনকে আটক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রের এই প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে।

বৃহস্পতিবার ৭ই (আগস্ট) ঘটনার দিন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চূড়ান্ত ভর্তি হতে এসে ধরা পড়েন ত্রিশালের বাসিন্দা ওবায়েত হাসান আফিক, যার গুচ্ছ ভর্তি রোল ছিল ২০১৬৯৭। তবে তাকে আটক করার পর বেরিয়ে আসে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, চূড়ান্ত ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় বিভাগে স্বাক্ষর করার সময়েই শিক্ষার্থীর আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন শিক্ষকরা। প্রবেশপত্রের ছবির সঙ্গে চেহারার মিল না থাকা এবং গুচ্ছ পরীক্ষায় ৭৬তম অবস্থানে থাকলেও ভাইভায় সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ে প্রাথমিক প্রশ্নগুলোরও সঠিক উত্তর দিতে না পারায় সন্দেহ আরও প্রবল হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন শিক্ষকেরা তার সঙ্গে আসা অভিভাবক সম্পর্কে জানতে চাইলে সে একটি কল দিয়ে ‘বড় ভাই’ পরিচয়ে হাজির করেন পনির উদ্দিন খান পাভেল নামের একজনকে। এতে শিক্ষকদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় এবং তারা বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেন।

পরে শিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদে দুজনের কথায় অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। এরপর সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীর মোবাইলে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পর্যবেক্ষণ করে পাভেলের সঙ্গে স্বাক্ষর করার কৌশল এবং ভর্তি সংক্রান্ত লেনদেনের আলাপের প্রমাণ পাওয়া যায়। একইভাবে পাভেলের ফোন পর্যালোচনা করে ভর্তি প্রত্যাশী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের বিভিন্ন এডমিট কার্ড এবং প্রার্থীদের ছবি দেখতে পান দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। শেষপর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের মুখে প্রক্সি জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করে নেয় আফিক।

তবে এ সময় পাবেলের ফোনে সিয়াম নামে একজনের কল আসে। তারপর অপর প্রান্ত থেকে বলতে শোনা যায় “ভর্তির কি অবস্থা ভাই?”। পরে কলের কথা শেষ হলে সিয়ামের পরিচয় জানতে চাওয়া হয় কিন্তু পাভেল তা জানায় না। এসময় সিয়ামের নাম ও নাম্বার দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাটাবেইজে সার্চ করেন অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম। দেখা যায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে আইন ও বিচার বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী। তার পুরো নাম সালমান ফারদিন সাজিদ সিয়াম।

পরে সিয়ামকে বিভাগে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে ও তার হুয়াটসএপের মেসেজ যাচাই করে পাভেলের সাথে তার সম্পর্ক খোজে পাওয়া যায় আরেক প্রক্সি কান্ডে।

সিয়ামের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তিনি কৌশিক কুমার চন্দ নামের এক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা প্রক্সি দিয়েছে যেখানে পাভেল তাকে প্রায় ১ লক্ষ টাকা দেয়ার প্রতুশ্রুতি করে। জানা যায়, প্রক্সি শিক্ষার্থী ইতিমধ্যেই ভর্তি হয়েছে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগে। কৌশিকের গুচ্ছ ভর্তি রোল ২০৪৩৯৩।

সিয়াম যখন স্বীকারোক্তি দিচ্ছিল, ঠিক সেই সময় তার মোবাইল ফোনে কল আসে শান্ত ভূইয়া নামের এক শিক্ষার্থীর। ফোনে শান্ত ফারদিনকে জিজ্ঞেস করেন, “তোর ক্যান্ডিডেটের নাকি সমস্যা হয়েছে?”

ঘটনাটি শিক্ষকরা গুরুত্ব সহকারে নিয়ে শান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে সিয়াম জানান, শান্ত ভূইয়া তার বন্ধু এবং বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সিয়াম আরও জানায়, মূলত শান্তর মাধ্যমেই তার সঙ্গে পনির উদ্দিন খান পাভেলের পরিচয় ঘটে।

জানা যায়, পনির উদ্দিন খান পাভেল ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বাসিন্দা। ভর্তি হতে আসা ওবায়েত হাসান আফিকের বাড়ি ত্রিশালের চরপাড়ায়।

এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারদিনের ফোনে পাওয়া যায় আরেক শিক্ষার্থীর ও. এম. আর এর ছবি। যিনি ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে।

তবে পাভেল বলছে বাবু নামের আরেকজনের নির্দেশে কাজ করেন তিনি৷ ভর্তি সংক্রান্ত সব বিষয় সে দেখে। এছাড়াও তিনি জানান লোক প্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের কৌশিক কুমার চন্দকে ভর্তি করতে বাবু আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে।

এ ঘটনায় ওবায়েত হাসান আফিকের প্রক্সি কে দিয়েছে তা এখনও জানা যায় নি। তবে আফিক ও কৌশিক এই দুজনেরই প্রক্সি দেয়া হয় জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে গুচ্ছ ভর্তি প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, বিভিন্ন ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রে পরীক্ষায় অসচ্ছতা, জামালপুরের কেন্দ্রকে টার্গেট করে গড়ে উঠা জালিয়াতি চক্রের বিস্তারসহ নানান প্রশ্নের।

এই পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, সকলের সহযোগিতায় সত্যটা যেন বের হয়ে আসে। ঘটনাটি জামালপুরে ঘটেছে, তবে সেটি আমাদের এখানে এসে সকলের স্বতঃস্ফূর্ত চেষ্টায় ধরা পড়েছে।

তদন্ত করলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সঠিক তথ্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যোগাযোগ থাকবে।

তবে ঘটনার তদন্তে যেন পুরো চক্রের বিষয়ে উঠে আসে সেই দাবি শিক্ষার্থীদের।