২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশবাসী। রাত পোহালেই ডাকসু নির্বাচন। ডাকসু মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। প্রায় ৪০ হাজার ছাত্রছাত্রী ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এটি ৩৮তম ডাকসু নির্বাচন হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব অর্জন করার পর প্রথম নির্বাচন। এর আগে ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পদার্পণের দুবছর আগে হয়েছিল। তারও আগে ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু নির্বাচন রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

সেই নির্বাচনে ছাত্রদলের আমান-খোকন প্যানেল বিজয়ী হয়েছিল। নির্বাচনটি হওয়ার পর নব্বইয়ের স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে এবং ডাকসুর ভিপি আমানউল্লাহ আমান ও জিএস খায়রুল কবীর খোকনের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠিত হয়। রাজনীতি ও আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য এরপর ডাকসু ঘুমিয়ে যায়। ২৯ বছর পর ২০১৯ সালে আবার ডাকসু নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে ভিপি হন নুরুল হক নুরু।

ছয় বছর পর আবার হচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। ডাকসু নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান করেছেন।

ডাকসুর সাবেক ভিপিরা ও এই নির্বাচন নিয়ে টকশোতে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। এসময় অনেকে বলেছেন ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাস সরগরম। মিছিল-মিটিং, ইশতেহার পাঠ, ভোট চাওয়া, টিভি বিতর্কে অংশ নেওয়া, ডাইনিং হলে একসঙ্গে খাওয়া, হলে হলে প্রচার—এক কথায় নির্বাচনের সব উপকরণ চোখে পড়ছে। নির্বাচন নিয়ে ক্যাম্পাস মাতোয়ারা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এবার ডাকসুতে ভোট বিপ্লব হবে। নির্বাচনটি দেশব্যাপী সাড়া ফেলেছে।

ডাকসুতে এবার ২৮টি পদে নির্বাচন হবে। প্রার্থী ৪৭১ জন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ৬২ জন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ১৩ শতাংশ। তবে ডাকসুতে মোট ভোটারের ৪৮ শতাংশই নারী। এবার ডাকসু নির্বাচনে প্রায় ৪০ হাজার ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার ১৮ হাজার ৯৫৯ জন। ভিপি পদে প্রার্থী ৪৫ জন। এর মধ্যে ছাত্রী পাঁচজন। সাধারণ সম্পাদক বা জিএস পদে প্রার্থী ১৯ জন। সেখানে ছাত্রী মাত্র একজন। অবশ্য একজন জিএস প্রার্থী আরেকজন জিএস প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের বাগছাস, দুটি বাম সংগঠন, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র অধিকারসহ স্বতন্ত্র প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ভিপি প্রার্থীদের মধ্যে ছাত্রদলের মো. আবিদুল ইসলাম খান, ছাত্রশিবিরের মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম), উমামা ফাতেমা, বাগছাসের আবদুল কাদের, ছাত্র অধিকারের মো. বিনইয়ামিন মোল্লা, শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি) উল্লেখযোগ্য। জিএস প্রার্থীদের মধ্যে ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারী হামিম, শিবিরের এসএম ফরহাদ, বামদের মেঘমল্লার বসু এবং বাগছাসের মো. আবু বাখের মজুমদার উল্লেখযোগ্য।

এদের মধ্যেই হবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এদের বেশিরভাগ প্যানেলের ইশতেহারে মিল রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংকট, নারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন, গবেষণায় মানোন্নয়ন, ফ্যাসিবাদ নির্মূল, ডাকসু সংস্কার ইত্যাদি। শেষ মুহূর্তে ডাকসু প্রার্থীদের মধ্যে মেরুকরণ হচ্ছে।

ভিপিপদে আবিদুল ইসলাম ও সাদিক কায়েমের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। গত কয়েকদিন নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সুন্দর ও সাবলীল ভাবে ভিপি প্রার্থীর টকশোতে অংশগ্রহণ করেছে। প্রত্যকে নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে কথা বলেছেন। তারা একে অপরকে পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে,একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ক্যাম্পাসে চমক সৃষ্টি করেছেন।

আবিদুল বলছেন, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নেই। আমি তো সেই ২০২৪ এর  ৫ আগস্টের পরই জিতে গেছি। ওর থেকে বড় বিজয় আমার জন্য আর কিছু হতে পারে না। সাধারণ শিক্ষার্থী ও দেশের গণতন্ত্রের সাথে আমৃত্যু কাজ করে যাবো।  এখন হারানোর কিছু নেই। সাদিকের বক্তব্য—ফ্যাসিবাদকে ছাড় নয়। ডাকসুতে সততার বিজয় হবে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এ বছর ডাকসুতে , ছাত্রী ছাড়া যিনিই ভিপি হবেন তিনি মাদরাসা থেকে আসা। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদরাসা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হতো না।

ডাকসুর ১০০ বছরের ইতিহাসে এর আগে তিনজন নারী প্রার্থী ভিপি ও জিএস হয়েছিলেন। ১৯৬০-৬১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম নারী ভিপি হন বেগম জাহানারা আক্তার। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হন মতিয়া চৌধুরী। এরপর ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর ভিপি হন মাহফুজা খানম, কিছুদিন আগে তিনি মারা যান। এবারের ডাকসু নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১১ জন নারী প্রার্থী দিয়েছে, সাতটি বামপন্থি ছাত্রসংগঠনের যৌথ প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ তাদের প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী হয়েছেন শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকা ছাত্রীদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী উমামা ফাতেমা ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামের প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী হয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য ছাত্রী প্রার্থীরাও রয়েছেন।

ডাকসুর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতে এর নাম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাসু)। শিক্ষার্থীদের এক টাকা চাঁদা দিয়ে এর সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু হয় দেশের স্বাধিকার, ভাষার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ডাকসুর। প্রাথমিক ভাবে অরাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি পায়। সে সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় এর তিনটি হল – ঢাকা হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল থেকে একজন করে শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি এবং উপাচার্য মনোনীত একজন শিক্ষক দিয়ে সংসদ গঠিত হত।

১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদ অনুমোদন করলে তা কার্যকর হয়। ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) রাখা হয়। প্রথমদিকে ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হত, ১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হয়। ১৯৫৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ডাকসুর প্রথম নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্যকে সভাপতি এবং ১৬ জন ছাত্র প্রতিনিধি থেকে ১০ জন কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়, কোষাধাক্ষের দায়িত্ব পালন করেন একজন শিক্ষক।  ১৯৭০ সালে ডাকসুতে পরোক্ষ নির্বাচনের বদলে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয়।

উল্লেখ্য, এবারের ডাকসু নির্বাচনে ৩৯ হাজার ৮৭৪ প্রায় (৪০ হাজার)  জন ভোটারের মধ্যে ১৮ হাজার ৯৫৯ জন ছাত্রী, অর্থাৎ প্রায় ৪৮ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ছাত্রী ভোটারদের অংশগ্রহণই হয়ে উঠতে পারে নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’। ছাত্রীরা নিজেরা বলছেন, তাদের নিরাপত্তা, পোশাকের স্বাধীনতা, গণপরিবহনে নিরাপত্তা এবং অনলাইন হয়রানি বন্ধ এসব ইস্যু যার ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে এবং বাস্তবায়নের আশ্বাস দেবে, তাকেই তাঁরা ভোট দেবেন।