ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় সংসদ গঠন নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে নতুন কমিটি। আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছেন তৃণমূল থেকে উঠে আসা দুঃসময়ের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা।

গত কয়েকটি কমিটিতে কেন্দ্রীয় সংসদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একক আধিপত্য থাকলেও এবার তা ভেঙে বিভিন্ন ইউনিটের যোগ্য নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হতে পারে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর আলোচনায় উঠে এসেছেন। ক্যাম্পাসে তিনি সৎ, অমায়িক ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে পরিচিত।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকেও বাবরের জন্মস্থান ও ক্যাম্পাসে একাধিকবার খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। এদিকে বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা কেন্দ্রে গুরুত্ব পেলেও ছাত্রদল বরাবরই অবহেলিত—এমন অভিযোগ রয়েছে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে।

জানা যায়, জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ২০০৯–১০ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ছাত্রদলের রাজনীতি করার কারণে তার ব্যাচের মধ্যে সর্বপ্রথম তাকেই হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি পড়াশোনা ও রাজনীতিকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে রাখেন।

২০১২ সালে হল কমিটিতে শহীদ সালাম-বরকত হলের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান তিনি। দায়িত্ব পালনকালে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রসায়ন বিভাগের পরীক্ষার সময় তাকে পরীক্ষাকক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে ছাত্রলীগের একদল কর্মী মারধর করে বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। পরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনার খবর জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীরবতা, ছাত্রলীগের হুমকি এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ পাঁচটি রাজনৈতিক মামলার কারণে দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে পারেননি বাবর। এতে তার শিক্ষাজীবনও শেষ করা সম্ভব হয়নি।

তবে এসব বাধা সত্ত্বেও তিনি সংগঠনের কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৬ সালে জাবি ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন শাখা কমিটি না থাকলেও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে কাজ করেন তিনি। বিএনপি ঘোষিত একদফা আন্দোলন বাস্তবায়নে ক্যাম্পাসে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট ডিবি পুলিশের হাতে চার দিন গুম থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরে তাকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কারামুক্ত হওয়ার পর ২৮ অক্টোবরের কর্মসূচিসহ বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটির আহ্বায়ক হন বাবর। দায়িত্ব পালনের দেড় বছরে তিনি নিজেকে বিতর্কের বাইরে রাখার চেষ্টা করেছেন বলে নেতাকর্মীরা দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দখল, সিট বাণিজ্য, ভিন্নমত দমন, সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির মতো কোনো অভিযোগ ওঠেনি বলে সংগঠনের নেতারা জানান। ফলে শাখা ছাত্রদলের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহম্মেদ সিয়াম বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ সব আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগরসহ অন্যান্য ইউনিটেরও ভূমিকা ছিল। তাই কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঢাবির একক আধিপত্য না রেখে সব ইউনিটকে মূল্যায়ন করা উচিত। আমাদের পছন্দের তালিকায় গুম থেকে ফিরে আসা ছাত্রনেতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর রয়েছেন।”

নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী তানজিল আকাশ বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে বাবর ভাইকে সজ্জন মানুষ হিসেবে জানি। ছাত্রদল না করলেও বিভিন্ন প্রয়োজনে তাকে পাশে পেয়েছি। আশা করি তিনি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাবেন।”

নজরুল হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হজরত জিসান বলেন, “জাবি ছাত্রদলকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গতিশীল করতে হলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জাবির প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন। নির্যাতিত ও গুম ফেরত ছাত্রনেতা বাবর ভাইকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে চাই।”

এ বিষয়ে জানতে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।