মা শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ ও জীবনের প্রথম আশ্রয়। এই মমতাময়ী মায়েদের সম্মান জানাতে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মা দিবস। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর নানা আয়োজন থাকলেও আধুনিক মা দিবসের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত Anna Jarvis। তিনি তাঁর মা অ্যান রিভস জার্ভিসের স্মৃতিকে স্মরণীয় করতে এই দিবস চালুর উদ্যোগ নেন।
১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালিত হয় এবং পরে ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Woodrow Wilson মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য মায়ের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও সম্মান প্রকাশ করা।
মা দিবসে মাকে ঘিরে নিজেদের বাস্তব জীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষার্থী লিখেছেন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আশরাফুল আলম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জেবা ফাউজিয়া আনিকা বলেন, প্রথমেই পৃথিবীর সকল মাকে জানাই মা দিবসের শুভেচ্ছা। মায়ের সাথে জড়িয়ে থাকা আমার কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি আছে, যেগুলো আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময়টা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। অনেক জায়গায় চান্স পাচ্ছিলাম না, হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু মা কখনো আমাকে ভেঙে পড়তে দেননি। তিনি সবসময় বলতেন, “না পেলেও সমস্যা নাই, আরেকবার চেষ্টা করবি। কিন্তু খারাপ কিছু করবি না, ভেঙে পড়বি না। পেলি তো ভালো, না পেলেও সমস্যা নাই।” মায়ের এই কথাগুলোই আমাকে সবচেয়ে বেশি শক্তি দিয়েছে। সেই সাহস আর মোটিভেশন নিয়েই আমি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাই।
তিনি আরও বলেন, আর যেদিন আমি চান্স পেলাম, মা আমাকে ১০,০০০ টাকা দিয়েছিলেন। হয়তো টাকার অঙ্কটা বড় ছিল না, কিন্তু সেই মুহূর্তের অনুভূতি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্জনের মতো ছিল। মনে হয়েছিল, আমি যেন পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পেয়েছি। মাকে আমি অনেক ভালোবাসি। সত্যি বলতে, মায়ের চেয়ে আপন আর কেউ হয় না। যত রাগ-অভিমানই থাকুক না কেন, দিন শেষে মা-ই থাকেন আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাইম হোসেন মা কে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার অষ্টম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার পরপরই জীবনে এমন এক কঠিন সময় নেমে এসেছিল, যা আজও কল্পনা করলে অবাক লাগে। নানা কারণে আমার বাবাকে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। সেই সময়ে আমার জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি, বাবার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গুছিয়ে নেওয়া এবং পরিবারের সব দায়িত্ব সামলানোর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল আমার মায়ের। অপরিণত বয়সে সংসারের এত বড় দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি।
তিনি আরও বলেন, হয়তো কোনোদিন মুখ ফুটে বলতে পারব না—“মা, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।” ঈদুল আজহার কোরবানির মাংস হাতে নিয়ে রান্না করা কিংবা পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করার মাঝেও হয়তো তাঁকে বোঝাতে পারিনি, তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা কত গভীর। সৃষ্টিকর্তার রহমতে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পরিবারকে তিল তিল করে আগলে রাখা সেই সংগ্রামী মাকে ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়—“মা, তোমাকে আমি অনেক সম্মান করি।” মা দিবসের একটি দিনকে ঘিরে নয়, বছরের প্রতিটি দিন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমাকে ভালোবেসে যেতে চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শীলা জাহান বলেন, ভালোবাসার জন্য মায়ের আলাদা কোনো দিবসের প্রয়োজন হয় না। মাকে ভালোবাসা প্রতিদিনের, প্রতিক্ষণের। তবুও বিশ্ব মা দিবস যেন সেই অব্যক্ত অনুভূতিগুলোকে নতুন করে প্রকাশ করার একটি উপলক্ষ। ক্যাম্পাসে এসেছি প্রায় ৪ বছর হয়ে যাচ্ছে। মায়ের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোর মধ্যে আমার একটা কথা খুব বেশি মনে পড়ে তা হচ্ছে প্রতিদিন সকালে আমাদের একসঙ্গে হাঁটতে বের হওয়া, মাঠে কে আগে রাউন্ড শেষ করবে এমন প্রতিযোগিতাও যা হয়ে উঠেছিল আমাদের প্রতিদিন সকালের আনন্দের অংশ। হাঁটতে হাঁটতে গল্প, হাসি আর অসংখ্য স্মৃতি জমে থাকত দু’জনের মাঝে। পুরো এডমিশন জার্নি আমার মা আমার সাথে দৌড়ে বেড়িয়েছেন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন,ভর্তি পরীক্ষা, ভাইবা এবং ফাইনাল ভর্তি পর্যন্ত।
তিনি আরও বলেন, মা প্রায়ই মজা করে বলতেন,
“সব জায়গায় তো আমাকে নিয়ে যাও, যখন হাঁটতে পারবো না তখন কী করবা?”
আমার জবাব থাকতো
“তখন হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যাবো, দরকার হলে।”
মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জায়েদ আহম্মদ বলেন, “মা” একটিমাত্র শব্দ, অথচ এর বিস্তার অনন্ত। জন্মের পূর্ব মুহূর্ত থেকেই যিনি সন্তানের অস্তিত্বকে আপন সত্তায় ধারণ করেন, জন্মের পর নিঃস্বার্থ স্নেহ, ত্যাগ ও মমতায় যিনি জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলেন—তিনি মা। মানবজীবনের সবচেয়ে নির্মল আশ্রয়, সবচেয়ে নির্ভরতার নাম মা। সন্তানের হাসির জন্য একজন মা নিজের স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য নির্বাকেই বিসর্জন দেন। সন্তানের বেদনায় যার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়, সন্তানের সাফল্যে যার চোখ আনন্দে দীপ্ত হয়—তিনিই মা।
তিনি আরও বলেন, মায়ের মহিমা কোনো নির্দিষ্ট দিবসের সীমায় আবদ্ধ নয়। তবুও আন্তর্জাতিক মা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশে যেনো আমরা কখনো উদাসীন না হই। আজ পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা—পৃথিবীর প্রতিটি মাকে শান্তি, সম্মান ও কল্যাণে পরিপূর্ণ রাখুন, ইহকাল ও পরকালে।
বাংলাদেশে মা দিবসের কোনো প্রাচীন ঐতিহ্য না থাকলেও পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ২০০০ সালের পর শহরাঞ্চলের তরুণদের মধ্যে দিবসটি বেশি প্রচলিত হয়। এদিন সন্তানরা মাকে শুভেচ্ছা জানায়, উপহার দেয়, একসঙ্গে সময় কাটায় এবং সামাজিক মাধ্যমে ছবি ও স্মৃতিচারণ শেয়ার করে। যদিও অনেকেই মনে করেন মাকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিনের প্রয়োজন নেই, তবুও মা দিবস মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি বিশেষ উপলক্ষ হিসেবে গুরুত্ব বহন করে।



মন্তব্য করুন