https://daynightbd.com


তথ্যপ্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগান্তকারী মেলবন্ধনে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাল বাংলাদেশ। দেশের একদল তরুণ গবেষকের হাত ধরে ওষুধি উদ্ভিদ গবেষণায় যুক্ত হলো এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে বাংলাদেশ এখন ওষুধি উদ্ভিদের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরিতে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করেছে।
এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যের মূল কারিগর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কৃতি শিক্ষার্থী এসকে ফয়সাল আহমেদ। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বায়োইনফরম্যাটিক্স-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডন অব বায়োইনফরম্যাটিক্স লিমিটেড’-এর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ আর গবেষণাগারের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে একসময় যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন; দীর্ঘ গবেষণা, পরিকল্পনা এবং নিরলস পরিশ্রমে সেটিই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
ভেঙে গেল ভারতের সাড়ে তিন গুণ বড় রেকর্ড
ডন অব বায়োইনফরম্যাটিক্সের তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটির নাম ‘Bangladesh Medicinal Plants and Phytochemicals Database’ (BMPPD)। এতদিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় ওষুধি উদ্ভিদের সবচেয়ে বড় ডাটাবেজটি ছিল ভারতের দখলে। দেশটির ‘আইএমপিপিএটি ২.০’ (IMPPAT 2.0) ডাটাবেজে ১৭ হাজার ৯৬৭টি ফাইটোকেমিক্যালের (উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত রাসায়নিক উপাদান) তথ্য সংরক্ষিত ছিল। তবে বাংলাদেশের গবেষকদের তৈরি নতুন এই ডাটাবেজে স্থান পেয়েছে প্রায় ৬৩ হাজার ইউনিক ফাইটোকেমিক্যালের তথ্য। সংখ্যার বিচারে যা ভারতের বিদ্যমান ডাটাবেজের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বড়। শুধু আকারেই নয়, তথ্যের বৈচিত্র্য ও গবেষণায় ব্যবহারযোগ্যতার দিক থেকেও এটি দক্ষিণ এশিয়ার ওষুধি উদ্ভিদ গবেষণায় এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
কী আছে এই ডাটাবেজে, কীভাবে কাজ করবে?
সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ডাটাবেজ তৈরিতে লেগেছে প্রায় দুই বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা। এতে বাংলাদেশের উর্বর সমভূমি, পাহাড়ি অঞ্চল ও উপকূলীয় পরিবেশে জন্মানো ৭০০-এরও বেশি দেশীয় ওষুধি উদ্ভিদের বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।
প্রতিটি উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান, জটিল আণবিক (মলিকুলার) গঠন, পরিচিত ভেষজ বৈশিষ্ট্য এবং হাজারো বায়োঅ্যাকটিভ যৌগের (Bioactive Compounds) তথ্য এখানে সুবিন্যস্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, এই যৌগগুলো নিয়েই বর্তমানে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ওষুধ উদ্ভাবনে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে।
ডাটাবেজটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যবহারবান্ধব নকশা (User-friendly Interface)। যেকোনো গবেষক বা শিক্ষার্থী এই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে মাত্র কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম, মলিকুলার ফর্মুলা, আণবিক ভর (Molecular Weight) এবং সম্ভাব্য জৈবিক কার্যকারিতা (Biological Activity) জানতে পারবেন। বিশ্বের স্বীকৃত ‘PubChem’ ও ‘ChEMBL’-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এটি তৈরি করা হয়েছে।
দুই বছরের গবেষণায় ছিল যেসব বড় চ্যালেঞ্জ:
বড় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা সরকারি অর্থায়ন ছাড়াই আন্তর্জাতিক মানের একটি বৈজ্ঞানিক ডাটাবেজ তৈরির পথটা কখনো সহজ ছিল না। প্রায় দুই বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, তথ্যসংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে Bangladesh Medicinal Plants and Phytochemicals Database (BMPPD) তৈরি করেছে গবেষক দল। এই দীর্ঘ যাত্রায় তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশের ওষুধি উদ্ভিদসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গবেষণাপত্র, বই ও আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে সংগ্রহ করে একটি কাঠামোবদ্ধ ডিজিটাল ডাটাবেজে রূপ দেওয়া। একই সঙ্গে প্রতিটি উদ্ভিদের ফাইটোকেমিক্যাল তথ্য একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করে ভুল ও পুরোনো তথ্য বাদ দেওয়াও ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ। ৭০০টিরও বেশি ওষুধি উদ্ভিদ এবং প্রায় ৬৩ হাজার অনন্য ফাইটোকেমিক্যাল যৌগের মলিকুলার স্ট্রাকচার আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংরক্ষণ ও সাজানো ছিল প্রযুক্তিগতভাবে জটিল একটি প্রক্রিয়া। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে বায়োইনফরম্যাটিক্স খাতের দক্ষ জনবলের সংকট, গবেষক ও ডেভেলপারদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং কোনো বড় সরকারি বা আন্তর্জাতিক অনুদান ছাড়া সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়েছে।
ওষুধ আবিষ্কারে নতুন দিগন্ত: বাঁচবে সময় ও কোটি টাকা
ঐতিহ্যগত বা প্রাচীন পদ্ধতিতে ল্যাবরেটরিতে কোনো ওষুধি উদ্ভিদের উপাদান থেকে নতুন ওষুধ তৈরি করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কোটি টাকার ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। অনেক সময় একটি কার্যকরী উপাদান খুঁজে পেতেই পার হয়ে যায় বছরের পর বছর।
কিন্তু এই ডিজিটাল ডাটাবেজটি ব্যবহারের ফলে আধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক বা ‘ইন সিলিকো’ ড্রাগ ডিজাইনিং (In silico Drug Designing) পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক রূপান্তর আসবে। ক্যানসার কিংবা নতুন কোনো প্রাণঘাতী ভাইরাসের ওষুধ তৈরিতে কোন উদ্ভিদের কোন উপাদানটি সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা এখন গবেষকরা ল্যাবে যাওয়ার আগেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে নিখুঁতভাবে ‘সিমুলেশন’ বা বিশ্লেষণ করতে পারবেন। এতে ওষুধ আবিষ্কারের প্রাথমিক ধাপের খরচ ও সময় নেমে আসবে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
“প্রকৃতি শুরু থেকেই যে ভাষায় কথা বলে এসেছে, তারই আধুনিক বৈজ্ঞানিক রূপ হলো বায়োইনফরম্যাটিক্স। BMPPD-এর মাধ্যমে আমরা প্রকৃতির সেই নিরাময়ের ভাষাকে ডিকোড করতে পেরেছি। এই ডেটাবেজের প্রতিটি যৌগের মাঝেই লুকিয়ে আছে একেকটি সম্ভাব্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, প্রকৃতির ভুলে যাওয়া কোনো নিরাময় কিংবা এক একটি অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা। আমরা বিশ্বাস করি, দক্ষিণ এশিয়ার ঔষধি ঐতিহ্যকে বায়োইনফরম্যাটিক্সের শক্তিতে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সময় এসেছে, আর সেই যাত্রা বাংলাদেশ থেকেই শুরু হলো।”
— এসকে ফয়সাল আহমেদ, সিইও, ডন অব বায়োইনফরম্যাটিক্স লিমিটেড।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এই অর্জন
দেশের প্রখ্যাত ওষুধ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতের ওষুধ আবিষ্কারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং বড় ভূমিকা পালন করবে। আর এআই-এর জন্য প্রয়োজন বিশাল ও নির্ভুল ডেটাসেট (Dataset), যার চমৎকার উৎস হতে পারে এই BMPPD। নোবিপ্রবির একজন শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন এই গবেষণা সম্পন্ন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তৈরি হয়েছে গর্বের আবহ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা এ অর্জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতার একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করেন, সঠিক দিকনির্দেশনা, গবেষণার অনুকূল পরিবেশ এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের তরুণ গবেষকেরাও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। ফয়সাল আহমেদ ও তাঁর দলের এই উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় প্রেরণা
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের পরিবর্তে দেশের গবেষণা ও বিজ্ঞানচর্চাকে এগিয়ে নিতে এই ডাটাবেজটি গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৪৫টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন।ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে ফয়সাল ও তাঁর দলের এই আবিষ্কার এখন জাতীয় প্রেরণা। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি অর্থায়ন পেলে এই ডাটাবেজকে আরও সমৃদ্ধ করে আন্তর্জাতিক ড্রাগ ডিসকভারি বা ওষুধ আবিষ্কারের বাজারে বাংলাদেশ অন্যতম অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লেখক: জিয়াউল করিম শামীম
শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ফোন: 01952383551


