রাজধানীর পুরান ঢাকার বাংলা বাজারের বুড়িগঙ্গার তীরের শ্রীশচন্দ্র লেনের ১ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত বিউটি বোর্ডিং। সাইনবোর্ড পেরিয়ে ছোট গেট দিয়ে হলুদ রঙের পদাতলা বাড়িটির আঙিনায় প্রবেশ করার পর বিউটি বোর্ডিংয়ের নান্দনিকতায় সৌন্দর্যপিপাসুদের নয়ন জুড়িয়ে যাবে। প্রাচীন আমলের গাঁথুনি মুহূর্তেই যে কাউকে নিয়ে যাবে ১০০ বছর পেছনে। ফুলের বাগান দিয়ে ঘেরা মাঝখানের প্রশস্ত উঠোন। পাশে খাবার ঘরের দেয়ালে টাঙানো আছে প্রাচীন আড্ডার কয়েকটি ছবি।   দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক—বিউটি বোর্ডিং। একসময় এই স্থান ছিল কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, রাজনীতিক ও মুক্তিকামী মানুষদের প্রাণের মিলনমেলা। কালের প্রবাহে ম্লান হয়েছে সেই জৌলুস, তবুও স্মৃতির দেয়ালে আজও ঝুলে আছে সোনালি দিনের অসংখ্য গল্প।

শিল্প-সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল বিউটি বোর্ডিং :

চল্লিশের দশকে প্রতিষ্ঠিত বিউটি বোর্ডিং দ্রুতই হয়ে ওঠে সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের অন্যতম আড্ডাখানা। এখানে নিয়মিত আসতেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আহমদ ছফা, আল মাহমুদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, জহির রায়হান, খান আতা, শেখ মুজিবুর রহমান, সত্য সাহা, সমর দাস ও জুয়েল আইচসহ অসংখ্য খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

এখানেই আবদুল জব্বার খান লিখেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পাণ্ডুলিপি। কবি ফজল শাহাবুদ্দিন এখান থেকে প্রকাশ করেছিলেন সাহিত্যপত্রিকা ‘কবিকণ্ঠ’, আর আহমদ ছফার ‘স্বদেশ’ পত্রিকার জন্মও হয়েছিল এই বোর্ডিং থেকেই।

বিউটি বোর্ডিংয়ের জন্ম ও ইতিহাস:

১১ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ভবনটি একসময় ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীরচন্দ্র দাসের মালিকানাধীন। দেশভাগের আগে এখানে ছিল সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার অফিস, যেখানে ছাপা হয়েছিল কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা।

১৯৪৯ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা এই ভবনে শুরু করেন আবাসিক ও খাবার হোটেল ‘বিউটি বোর্ডিং’। নামকরণ করা হয় নলিনী সাহার মেয়ে বিউটির নামে।

মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়:

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা বিউটি বোর্ডিংয়ে হামলা চালায়। শহীদ হন এর অন্যতম কর্ণধার প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন মুক্তিকামী মানুষ। উঠোনে স্থাপিত শহীদ স্মৃতিফলক আজও স্মরণ করিয়ে দেয় জাতির ত্যাগ ও বেদনার ইতিহাস।

স্বাধীনতার পর পুনর্জন্ম, তবে হারানো গৌরব আর ফিরে আসেনি:

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর ও তারক সাহাকে নিয়ে পুনরায় প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন। আগের মতো সাহিত্য-আড্ডা না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো ভোজনরসিকদের পদচারণা লেগে থাকে। ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো এখানে স্টিলের থালা ও গ্লাসে খাবার পরিবেশন করা হয়।

বর্তমানে ২৫টি কক্ষের বেশিরভাগই খালি থাকে। বড় কক্ষের ভাড়া ১,২০০ টাকা, আর সিঙ্গেল রুম ২০০–৩০০ টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়।

ম্যানেজারের চোখে ইতিহাস:
১৯৭৫ সাল থেকে বিউটি বোর্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত আছেন বর্তমান ম্যানেজার বিজয় পোদ্দার। তিনি বলেন, দিনের পর দিন লোকসান দিয়েও আমরা শুধু ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে হয়তো বেশিদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।”

তিনি স্মরণ করেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে এক মধুর অভিজ্ঞতা। একবার তিনি নিজ পরিচয় দেওয়ার পরও আমি চিনতে পারিনি। তখন তিনি তাঁর ‘কবর’ কবিতার অংশ শুনিয়েছিলেন। আজও সেই মুহূর্ত মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়।”

ট্রাস্ট গঠন ও সম্মাননা প্রদান:

১৯৯৫ সালে সাবেক বিউটিয়ানদের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘বিউটি বোর্ডিং সুধী ট্রাস্ট’। ২০০৩ সালে কবি ইমরুল চৌধুরী আহ্বায়ক ও তারক সাহা সদস্য সচিব হিসেবে ৬০ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। ২০০৫ সাল থেকে শুরু হয় ‘বিউটি বোর্ডিং সম্মাননা’—যা প্রতিবছর সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হয়।

সরেজমিনে বিউটি বোর্ডিং :

সময় পাল্টেছে, তবে বিউটি বোর্ডিং এখনো টিকে আছে তার ঐতিহ্যের ছায়া বুকে নিয়ে। সাহিত্য-আড্ডা কমে এলেও এখানকার চা–কফি আর দুপুরের খাবার এখনো টানে পুরান ঢাকার মানুষকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা বলেন, ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিউটি বোর্ডিং নিয়ে অনেক কিছু দেখেছি, শুনেছি। সরাসরি এসে মনে হলো, যেন পুরনো এক সাহিত্য আড্ডায় ফিরে গেছি।

আরেক শিক্ষার্থী ও ভ্রমণপ্রেমী ইব্রাহিম মন্ডল  জানান, আমার ক্যাম্পাস থেকে খুব কাছেই। মন খারাপ থাকলে বা একা থাকতে ইচ্ছে করলে এখানে চলে আসি। শহরের মধ্যে এমন নস্টালজিক পরিবেশ আর কোথাও পাই না।

স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে আসা আরিফ হোসেন বলেন,
আমার স্ত্রী অনেক দিন ধরে এখানে আসতে চাইছিলেন। আজ এসে দেখি সত্যিই দারুণ একটা জায়গা। পুরান ঢাকার এই শান্ত পরিবেশে বসে আড্ডা দেওয়া, সময় কাটানো—এক কথায় অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

কালের সাক্ষী এই বিউটি বোর্ডিং আজও ধরে রেখেছে ঢাকার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অবিনাশী অংশ। সময়ের ধুলোয় মলিন হলেও এটি এখনো নস্টালজিয়ার প্রাণকেন্দ্র পুরান ঢাকার হৃদয়ে জেগে থাকা এক সাংস্কৃতিক বাতিঘর।