https://daynightbd.com


ড. তৌহিদুল হক
প্রতিটি রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যানুসারে শৃঙ্খলা-বিধান, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা ও সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা প্রদান তথা সকল পর্যায় থেকে দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন বাহিনী সৃষ্টি করে দায়িত্ব বণ্টনের মধ্য দিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করে। প্রতিটি বাহিনীর সদস্যরা নির্দিষ্ট কর্মবিধি অনুসারে কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্ধারিত দায়িত্বের পরিধি যথাযথভাবে পালন করলে একটি দেশের সার্বভৌমত্বের সংরক্ষণ সর্বত্র সুরক্ষিত থাকে। এরূপ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং একইসাথে এরূপ প্রয়োজনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু থেকে কর্মবিধি ও নির্দিষ্ট কর্মইউনিটে বিভক্ত হয়ে উপকূলবর্তী সকল নিরাপত্তা বিধানে বাহিনীটি কাজ করছে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল, বনঘেঁষা চরাঞ্চল ও আরো বৃহৎ পরিসরে সমুদ্র উপকূলবর্তী সকল শৃঙ্খলাগত সংকটে মানুষের প্রয়োজন পূরণে কোস্ট গার্ড সর্বদা সতর্ক ও সক্রিয়।
এই প্রয়োজনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা বিধান, বিভিন্ন সংকটে সহযোগিতা প্রদান, সমুদ্রকে ব্যবহার করে নানাধরনের অপরাধগোষ্ঠীর তৎপরতা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্রকেন্দ্রিক জীবনজীবিকায় নিয়োজিত মানুষের সকল প্রয়োজন পূরণের অগ্রপথিক হিসেবে কাজ করা। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী কিংবা নদীবেষ্টিত মানুষের সংখ্যা অনেক। নদী কিংবা সমুদ্র জীবন-জীবিকা নির্বাহের একটি উপযুক্ত মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এই মাধ্যমে যে সমস্ত মানুষ জড়িত তারা সংখ্যায় একেবারে কম নয়। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রয়োজন, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি এবং অধিকতর স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ জীবনযাপনের প্রশ্নে কর্মতৎপরতা নির্ধারণ, কর্মবণ্টন ও গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নানাবিধ কাজ সম্পন্ন করা হয়।
কোস্ট গার্ড কর্মসফলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় সমুদ্রের সুরক্ষা, জীবনজীবিকায় নিশ্চয়তা প্রদান, দেশের অভ্যন্তরে নদীকেন্দ্রিক প্রয়োজনে পেশাদারিত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড উপকূলীয় মানুষের জবানে একটি বিশ্বস্ত বাহিনীতে পরিণত এবং মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতার মর্যাদায় উপনীত হয়েছে।
সুন্দরবন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনই নয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় এবং লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালীসহ বননির্ভর মানুষের আয়-রোজগার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং উপকূলীয় অর্থনীতির সঙ্গে সুন্দরবনের অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বন নিরাপদ থাকলে নিরাপদ থাকে বনজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকা। এই নিশ্চয়তা প্রান্তিক জনগণের নিজ আবাসে থেকে আয়-উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে যা তাদের প্রত্যাশা ও ক্ষমতায়নের উপজীব্য।
এই গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নিয়মিত নদীপথে টহল, গোয়েন্দাভিত্তিক নজরদারি, বনদস্যু দমন, বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধ, অবৈধ শিকার রোধ এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীটি সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করছে। একইসাথে, সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় জরুরি উদ্ধার, মানবিক সহায়তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কোস্ট গার্ডের কার্যক্রম বনজীবী মানুষের মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করেছে। এরূপ কাজ অংশগ্রহণমূলক ও পারস্পরিক কর্ম-তৎপরতাকে ইঙ্গিত করে। যেখানে আস্থা, নির্ভরতা, ও সহযোগিতা পূর্ণতা পায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের কিছু এলাকায় বনদস্যুদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনায় বনজীবীদের মধ্যে আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দাভিত্তিক বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করে এবং বনদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। আর এর ফলাফল হলো বনদস্যুদের অপরাধ-কর্ম নিয়ন্ত্রণ ও উপকূলে বসবাসকারীদের নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে রাখা।
‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর মতো বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে কোস্ট গার্ড বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, ৪৫ জন বনদস্যুকে আটক এবং দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪২ জন বনজীবীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। ধারাবাহিক অভিযানের ফলে বনদস্যু চক্রগুলোর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় নদ-নদীতে জলদস্যুতা, সশস্ত্র ডাকাতি, চোরাচালান রোধে এই বাহিনী কাজ করে থাকে। জলদস্যুদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করে। জলসীমান্ত ব্যবহার করে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে এই বাহিনীর সর্বদা সোচ্চার। অন্যদিকে, জলসীমান্তের সার্বিক নিরাপত্তা এই বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কঠোরতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য সম্পদ, খনিজ সম্পদ, তেল, গ্যাস ও বনায়ন রক্ষা করা এই বাহিনীর অন্যতম কাজ। সাগরে তেল বা অন্য কোনো বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ রোধেও এই বাহিনী সচেতনতা সৃষ্টিসহ নানাভাবে সমুদ্র ব্যবহারকারীদের সচেতন করে। এসব উদ্যোগ সুন্দরবনে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ধারাবাহিক তৎপরতার ফলে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়দের মতে, কোস্ট গার্ডের সক্রিয় উপস্থিতি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং নিয়মিত অভিযানের কারণে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে দীর্ঘদিন পর বনজীবীরা অনেকটাই স্বস্তির সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন এবং সুন্দরবনে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসতে শুরু করেছে। নদী ও সমুদ্রে কোনো জলযান দুর্ঘটনার শিকার হলে বা ডুবে গেলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার, বিপদগ্রস্ত জেলেদের সহায়তা এবং বিপদস্থ অবস্থান থেকে উপকূলে নিয়ে আসা এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা অন্যতম কাজ হিসেবে পালন করে। দেশের জলসীমা ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনে কাঠামো ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এই বাহিনীর অন্যতম কাজ।
বিশ্বের যে সমস্ত দেশ সমুদ্র কিংবা নদ-নদী দ্বারা বেষ্টিত সেই সমস্ত দেশ সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশে সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার যে প্রয়াস, ভাবনা এবং এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থানসহ পারিবারিক পর্যায়ে আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার কাজে এই বাহিনী অন্য দেশের মতো অর্থপূর্ণ ভূমিকা পালনের দক্ষতায় কাঠামোবদ্ধ ও পেশাগতভাবে তৎপর। নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে লক্ষ্য যে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার সাথে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র অর্থাৎ ব্লু ইকোনমি তথা সুনীল অর্থনীতির ক্ষেত্র ও সম্ভাবনা উন্মোচনে গবেষণার পরিসর সমৃদ্ধ করা এবং ব্যবহার ক্ষেত্রে দেশীয় মডেল উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে এই বাহিনী যথেষ্ট সতর্ক। কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির এই নতুন ক্ষেত্রকে বেগবান করছে।
তবে সুন্দরবন, জলসীমা, ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়। বনজীবী, স্থানীয় জনগণ, বন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থা এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই বিশ্ব ঐতিহ্যকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের চলমান অভিযান, নজরদারি ও পেশাদার তৎপরতা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সুন্দরবন যেমন আরও নিরাপদ হবে, তেমনি নিরাপদ থাকবে এর ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের এই অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। যে রাষ্ট্র প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছে তারা নানাভাবে এগিয়েছে। বাংলাদেশেরও সেই সম্ভাবনা প্রচুর সমৃদ্ধময়। প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা আর এর বাস্তবায়ন। এক্ষেত্রে এই বাহিনী তার পেশাদারিত্বের সাথে গৃহীতব্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য করার পর্যায়ে অবতীর্ণ হয়েছে।
লেখক:
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: tawohid@gmail.com


