• শিরোনাম

    ধর্মের কল যে বাতাসে নড়ে!

    কাজী ওয়াজেদ আলী | শুক্রবার, ১৭ মে ২০২৪

    ধর্মের কল যে বাতাসে নড়ে!

    জীর্ণ পোশাকে শীর্নকায় মেয়েটি তার বাবাসহ খালি পায়ে ঢুকলো ওসির রুমে। মেয়েটির বাবাকে‌ দেখে মনে হল, গ্রামের সহজ সরল অতি দরিদ্র পরিবারের মানুষ।

    কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি বলল, সে মিরপুরে‌ এক মহিলার বাসায় কাজ করে।‌ মহিলার স্বামী বিদেশ থাকে বলে শুনেছে, তবে কখনো দেখেনি। বাসায় মাঝে মধ্যে মহিলার মেয়ে এবং মেয়ের জামাই আসে। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি বলল, সারাদিন সাংসারিক যাবতীয় কাজকর্ম সুন্দরভাবে করার পরও গৃহকর্তী তাকে ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন করে।‌ এমনকি খেতেও দেয় না ঠিকমত। ক্ষুধার জ্বালায় মেয়েটি ছটফট করেছে, কান্নাকাটিও করেছে, তবুও মহিলার একটু দয়া হয়নি তার প্রতি। আজ তার বাবা আসলে সে বাবার সাথে পালিয়ে থানায় এসেছে বিচার চাইতে। মেয়েটি এবং তার বাবার কথা শুনে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে থানার সবচেয়ে বিচক্ষণ অফিসারকে দিয়ে সাথে সাথে পাঠিয়ে দিলাম।

    বাবাসহ মেয়েটিকে নিয়ে আমার অফিসার ঘটনাস্থল বাড়িতে গিয়ে খুব অবাক হলো।‌ পঞ্চাশোর্ধ গৃহকর্তী মহিলা মেয়েটি এবং তার বাবাকে চিনতেই পারল না। বলল মেয়েটিকে সে চেনেনা, কখনো এই বাসায় ও কাজ করেনি। জীবনে কখনো এদের দেখেওনি। বাসার পরিবেশ দেখে আমার অফিসারের ধারণা গৃহকর্তীর পরিবার উচ্চ মধ্যবিত্ত।

    পুলিশ কেন বাসায় গিয়েছে এজন্য মহিলা আমার অফিসারের সাথে খুব চোটপাট শুরু করল। মহিলা প্রমাণ করার চেষ্টা করল ছোট্ট মেয়েটি এবং তার বাবা ব্ল্যাকমেইলার। মহিলার কথার দৃঢ়তা দেখে আমার অফিসারও ভাবল হয়তো এমনটা হতেও পারে। ঘটনাস্থল থেকেই আমার অফিসার ফোনে আমাকে বিস্তারিত জানানোর পর চলে আসতে চাইলো। কিন্তু কি মনে করে যেন বললাম, মহিলাকে আমার সালাম দিয়ে একটু চা খাওয়ার জন্য সম্মানের সাথে নিয়ে আসেন। মহিলা এতে খুব বিব্রত হল, কিন্তু তারপরও বুঝিয়ে সুজিয়ে সম্মানের সাথে ওনাকে থানায় আনা হলো। আনার পথে মহিলা তার লোকজনকে থানায় যাওয়ার বিষয়টা অবহিত করলো।

    থানায় এসেও ওসির রুমে মহিলা খুব চড়া গলায় বলল ওদের চেনেই না। মহিলার কথা শুনে গ্রামের সহজ-সরল মানুষদুটো খুব আশ্চর্য হল। ইতোমধ্যে খবর পেয়ে মহিলার মেয়ে ও মেয়ের জামাই (ব্যারিস্টার) ওসির রুমে ঢুকলো। ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আসার কারণে তারাও খুব বিরক্তি প্রকাশ করল।

    দুই পক্ষের কথা শুনতে শুনতেই একজন লোক হঠাৎ রুমে ঢুকে স্যালুট দিয়ে নিজেকে পুলিশ সার্জেন্ট এবং ওই মহিলার দূর সম্পর্কের আত্মীয় পরিচয় দিল। রুমের মধ্যে ইতোপূর্বে আলাপচারিতার কোন কথা না শুনেই সাথে সাথে সার্জেন্ট সাহেব ওই মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল মামি, আপনাকে আগে অনেকবারই বলেছি এই কাজের মেয়েটিকে সুন্দরভাবে বিদায় করে দেন। কোনো ঝামেলা করার দরকার নেই। সার্জেন্ট সাহেবের কথা শুনে মনে হল, সে অনেকবারই তার মামীর বাসায় গিয়েছে এবং কাজের মেয়েটিকে দেখেছে। এছাড়া কাজের মেয়েটিকে নিয়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে সেটাও সে জানে। আজ মহিলাকে থানায় নিয়ে আসার খবরে সে ছুটে এসেছে।

    সার্জেন্ট সাহেবের কথা শোনার সাথে সাথে রুমের পরিবেশ চেঞ্জ হয়ে মুহূর্তেই সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলাম! এতক্ষণ কিভাবেই না মহিলা চরম মিথ্যা বলে সবাইকে বিভ্রান্ত করেছে। সাথে সাথেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল। সবকিছু দেখে আমার এবং আমার অফিসারের পায়ের রক্ত মাথায় উঠলো। মহিলা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। একচেটিয়ে মিথ্যা বলে যাওয়ার পর প্রকৃত সত্য উদঘাটন হওয়ায় আবেগে মেয়েটি এবং ওর বাবা কেঁদে ফেলল।

    আমার মনের পরিস্থিতি বুঝে মহিলা, মহিলার মেয়ে, মেয়ের জামাই এবং সার্জেন্ট সাহেব করজোড়ে ক্ষমা চাইল। বললাম, একে তো নিরীহ একটি মেয়েকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক নির্যাতন করেছে, তার ওপর মিথ্যা বলে সবাইকে বিপাকে ফেলেছে, এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ।

    মহিলার বিরুদ্ধে শক্তভাবে মামলা নিতে বললাম। মহিলা এবং তার আত্মীয়-স্বজন বিভিন্ন ক্ষমতাশালী জায়গা থেকে ফোন করে এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুতেই মাথা নত করিনি। তার আচরণ ছিল অত্যন্ত ঘৃণিত ও ন্যাক্কারজনক। মহিলার জঘন্যতম কৃতকর্মের জন্য আইনের কঠোরতম ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হলো।

    আর্থিকভাবে সচ্ছল একটি পরিবারের পঞ্চাশোর্ধ মহিলার আচরণ কেন এমন হলো তা আজও আমার বোধগম্য হয়নি।

    অনেকদিন পর হঠাৎ ঘটনাটা মনে হল। আর মনে হল আসলে সত্য কখনো চেপে রাখা যায় না। কারণ ধর্মের কল যে বাতাসে নড়ে!

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১৭ মে ২০২৪

    daynightbd.com |

    আর্কাইভ

    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০